ইনশাআল্লাহ ২০২৫ সালের পরে আর কোনো কষ্ট থাকবে না


কিছুমিছু
অথর
পাঠক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :১৩ মে ২০১৯, ৮:১২ পূর্বাহ্ণ
ইনশাআল্লাহ ২০২৫ সালের পরে আর কোনো কষ্ট থাকবে না

চকমল সাহেব অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসতেই মিস বৈশাখি সামনে এসে দাঁড়াল। মিস বৈশাখির চলাফেরায় ঝড়-ঝড় একটা ভাব আছে। চকমল সাহেব মনে করেন, এ মহিলার নাম বৈশাখি না হয়ে কালবৈশাখি হওয়া উচিত ছিল। লোকজন তাহলে নাম শুনেই তার গতিবেগ সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যেত। মিস বৈশাখি উত্তেজিত গলায় বলল-

: স্যার, খবর শুনছেন?

খবর শোনার প্রতি চকমল সাহেব আগ্রহ দেখালেন না। সকাল থেকে তার দাঁতব্যথা শুরু হয়েছে। দুটো প্যারাসিটামল একসঙ্গে খাওয়ার পরও কাজ হচ্ছে না। ব্যথায় চকমল সাহেব কুঁকড়ে যাচ্ছেন। মিস বৈশাখির এদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, খবর না শুনিয়ে সে ছাড়বে না। চকমল সাহেব বামগাল চেপে ধরে বললেন-

:

কীসের খবর!

: আমাদের এক মন্ত্রী বলেছেন, দেশে কোনো দরিদ্র লোক থাকবে না!

মিস বৈশাখি এ অফিসের প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর। চকমল সাহেবের ধারণা, এই মহিলার জ্ঞানের পরিধি খুবই সীমিত। ধান গাছে শুধু ধান থাকে না; সঙ্গে চিটাও থাকে। চিটা কোনো কাজের জিনিস না। দেশের মন্ত্রী-মিনিস্টারদের কথাবার্তার অধিকাংশই হচ্ছে চিটাজাতীয়। চিটা নিয়ে নাচানাচি করার কোনো মানে হয় না- এটা বোঝার ক্ষমতা এ মহিলার নেই। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, মন্ত্রীর কথা শুনে তার পেটের ভাত সব চাল হয়ে গেছে। পেটভর্তি চাল নিয়ে সে এখন খুব সমস্যার মধ্যে আছে। চকমল সাহেব মিস বৈশাখির দিকে তেরছা চোখে তাকিয়ে বললেন-

: দেশে কোনো দরিদ্র লোক থাকবে না?

: না।

: কোথায়

যাবে! ইন্ডিয়া, না পাকিস্তান?

: কোথাও যাবে না স্যার; নির্মূল করা হবে।

: বলেন কী! এতগুলো মানুষরে নির্মূল করে ফেলা হবে?

: স্যার, আপনি বুঝতে পারছেন না; মানুষ নির্মূল করা হবে কেন! দারিদ্র্য নির্মূল করা হবে।

মানুষ অল্প দুঃখে কাঁদে। অধিক দুঃখে হাসে। দাঁতব্যথা উপেক্ষা করে চকমল সাহেব হাসতে লাগলেন। দারিদ্র্য নির্মূল হাস্যকর একটি কথা। দারিদ্র্য নির্মূল করা যায় না, এটি হ্রাস করা যায় মাত্র। চকমল সাহেব নিজেও দারিদ্র্য হ্রাস করার মহান কাজে নিয়োজিত। তিনি দেখেছেন, এ দেশের মানুষের দারিদ্র্য নিয়ে সেই পাকিস্তান আমল থেকে কী পরিমাণ ঢাকঢোল পেটানো হয়েছে! অনেক ডক্টরেট-ইঞ্জিনিয়ার, অনেক রাজনীতিক-অর্থনীতিবিদ, অনেক ওঝা-বৈদ্য বাংলাদেশের দারিদ্র্যকে উপজীব্য করে চিত্রনাট্য তৈরি করেছেন। এজন্য

দাতাদের কাছ থেকে মূল্যবান পরামর্শ ও কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাওয়া গেছে। অনেক রকম পুরস্কারও পাওয়া গেছে। প্রাপ্তির তালিকায় নোবেল শান্তি পুরস্কারও রয়েছে।

কিন্তু হায়! এত সাহায্য, এত পরামর্শ ও পুরস্কারের ধাক্কা খাওয়ার পরও এ দেশ দারিদ্র্য থেকে লেজ গুটিয়ে পালায়নি; বরং নতুন নতুন রূপ ধরে আবির্ভূত হচ্ছে। এখন মান্যবর এক মন্ত্রী দারিদ্র্য নিয়ে উৎসাহী হয়ে উঠেছেন। খুবই ভালো কথা! হাতি-ঘোড়া গেল তল- খরগোস বলে কত জল! চকমল সাহেবের মনে হল, এর চেয়ে মন্ত্রী বাহাদুর যদি বলতেন- কিভাবে রাতারাতি কোটিপতি হতে হয়, এর গোপন ফর্মুলা তার জানা আছে এবং সেই ফর্মুলা বিতরণ করে তিনি দেশে কোটিপতির সংখ্যা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবেন, তাহলে সেটা

একটা কাজের কথা হতো। চকমল সাহেবের ভাবনার জাল ছিন্ন হল। মিস বৈশাখি উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল-

: স্যার! আমাদের এনজিও কি বন্ধ হয়ে যাবে!

অবাক হয়ে চকমল সাহেব বললেন-

: এনজিও বন্ধ হবে কেন!

: বাংলাদেশে যদি কোনো দরিদ্র লোক না থাকে, তাহলে আমরা কাজ করব কাদের নিয়ে?

চকমল সাহেব এবার মুখ না খুলেই হাসলেন। বললেন-

: দেশে কোটিপতির সংখ্যা অনেক আগেই ৫০ হাজারের ঘর অতিক্রম করছে- এই খবর রাখেন? এনজিও বন্ধ হইয়া গেলে আমরা কোটিপতিদের বাসায় কাঁচাবাজার ও বুয়া সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু করব। আপনার কাজ হবে ফোনে ক্লায়েন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্ডার নেয়া। কী, পারবেন না?

: অবশ্যই পারব স্যার।

: ঠিক আছে; এখন যান, কাজ করুন।

আর বসে থাকা যাচ্ছে না। দাঁতব্যথার বিটলামি অসহ্য হয়ে উঠেছে। ধানমণ্ডি এলাকায় চকমল সাহেবের পরিচিত একজন দন্তচিকিৎসক আছেন। তিনি সেখানে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন, এমন সময় পিয়ন ওইদিনের পত্রিকা আর চায়ের কাপ সামনে রাখল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে পত্রিকায় চোখ রাখতেই চকমল সাহেব দেখলেন- দারিদ্র্য নির্মূল সংক্রান্ত সংবাদটি পত্রিকায় খুব গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। মন্ত্রী দেশ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল করার জন্য ২০২৫ সালের টার্গেট বেঁধে দিয়ে বলেছেন- এ সময়সীমার মধ্যে বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী ও সমৃদ্ধশালী সোনার বাংলায় পরিণত করা হবে। চকমল সাহেব দাঁতে জিহ্বা লাগিয়ে চোঁ চোঁ শব্দ করতে করতে বললেন-

: গুড। ভেরি গুড।

চকমল সাহেব পত্রিকা রেখে ওঠে পড়লেন। এমন কেদরানিমার্কা কথাবার্তা মন্ত্রী-মিনিস্টাররা প্রায়ই বলে থাকেন। চকমল সাহেবের চোখের সামনে একটা প্রাণীর ছবি ভেসে উঠল। প্রাণীটার নাম কচ্ছপ। সমুদ্রের জল থেকে ডাঙ্গায় এসে ডিম দেয়ার পর জলের কচ্ছপ জলে চলে যায়। ডিমগুলো চিলের পেটে গেল, না শিয়ালের পেটে গেল- তার খোঁজ সে রাখে না। মন্ত্রী-মিনিস্টারাও তাদের কথাবার্তা বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে দিয়েই খালাস। কথার বাস্তবায়ন কতটুকু হল- তা দেখার প্রয়োজন অনুভব করেন না। রাস্তায় আসার পর চকমল সাহেব দেখলেন, একজন ভিক্ষুক চুপচাপ সড়কের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চকমল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন-

: চাচাজি! বর্তমানে রেস্টে আছেন নাকি?

চকমল সাহেবের কথার মর্মার্থ উদ্ধার করতে না পেরে ভিক্ষুক হা করে তাকিয়ে রইল। চকমল সাহেব পুনরায় বললেন-

: চাচাজি! জানতে চাইছিলাম- ভিক্ষা না কইরা এইখানে দাঁড়াইয়া রইছেন কীজন্য?

: কাউলাকাউলি ভালা লাগে না।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অন্য ভিক্ষুকদের পর্যবেক্ষণ শেষে চকমল সাহেব বললেন-

: কাউলাকাউলি না করলে তো ভিক্ষা পাবেন না!

: না পাইলে আর কী করবাম!

: এই লাইনে কত বছর ধইরা আছেন?

: বেশি দিন না।

: ভিক্ষা কি আপনের পেশা, না নেশা?

: কিতা কইন! নিশা অইত কেরে? পেটের দায়ে ভিক্ষা করি বাজান।

: আগে কি করতেন?

: আগে তো জমিজমা আছিল- চাষবাষ করতাম।

: সেই জমিজমা কী হইছে?

: সব গাঙের পেটে গেছে।

চকমল সাহেব ভাবলেন, এ দেশের মানুষের নিঃস্ব হওয়ার পেছনে যেসব কারণ বিদ্যমান, নদীভাঙন তার মধ্যে অন্যতম। ভাঙনরোধসহ নদী ব্যবস্থাপনার কাজগুলো সততার সঙ্গে করা হলে অনেক মানুষ দারিদ্র্যের শিকার হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেত। বাংলাদেশে বর্তমানে সততা দুর্লভ বস্তু হয়ে ওঠেছে। নদীতে ১ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে বলা হয় ৪০ হাজারের কথা। ৫ হাজার সিসি ব্লক হিসাবের খাতায় ৫০ হাজার হয়ে যায়। শুধু নদ-নদী নয়, প্রতিটি সেক্টরে দুর্নীতি সীমাহীন। দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেন না- এ কথা মন্ত্রিসভার ক’জন সদস্য বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন? দারিদ্র্যের হার কমাতে হলে মন্ত্রীদের অবশ্যই দুর্নীতি বন্ধ করার শপথ নিতে হবে। চকমল সাহেব বৃদ্ধ ভিক্ষুককে বললেন-

: চাচাজি! দাঁতে দাঁত কামড়াইয়া আর কয়টা বছর কষ্ট করেন; ইনশাআল্লাহ ২০২৫ সালের পরে আর কোনো কষ্ট থাকবে না।

এ ধরনের কথাবার্তা বৃদ্ধের কাছে নতুন। সে অবাক হয়ে তাকাতেই চকমল সাহেব বললেন-

: আমাদের এক তালেবর মন্ত্রী বলেছেন- ২০২৫ সালের পর তিনি দেশে কোনো দরিদ্র লোক রাখবেন না।

বৃদ্ধ আঁতকে উঠে বলল-

: মাইরা ফেলবাইন নাকি!

: না-না, মারবেন না! সবাইরে উনি ধনী বানাইয়া দিবেন।

বৃদ্ধ ভিক্ষুক আকাশের দিকে মুখ তুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নাড়তে নাড়তে বলল-

: এইতা অইল আবাইল্যা কথাবার্তা…

মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

mokamia@hotmail.com