ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব


অথর
ডোনেট বাংলাদেশ ডেক্স   ধর্ম ও জীবন
প্রকাশিত :২৫ মে ২০১৯, ৩:১৪ অপরাহ্ণ | পঠিত : 119 বার
ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব

ইসলাম শ্বাশ্বত জীবন-ব্যবস্থা। ইসলামে মানবজাতির অমীমাংসিত কোন বিষয়ের স্থান নেই। ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসনে জাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলামের মূল পাঁচ রোকনে একটি হলো- জাকাত। নামাজ ও রোজাকে শারীরিক ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। আর হজকে শারীরিক ও আর্থিক ইবাদতের সমন্বয় হিসেবে গণ্য করা হয় ৷ নিরেট আর্থিক ইবাদত একমাত্র জাকাত। তাই পরম যত্নে জাকাতকে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

বিত্তশালীগণ যদি সঠিক পরিমাণ ও সঠিক পদ্ধতিতে জাকাত প্রদানে এগিয়ে আসতেন, এদেশে দরিদ্রের হার ধারাবাহিকভাবে নিম্নগামীই হতো। কিন্তু আমাদের দেশে লক্ষ্য করা যায় কেবল রমজান আসলেই বিত্তশালীগণ নামমাত্র জাকাত প্রদান করেন। জাকাত ব্যবস্থার এ অসম বণ্টনের ফলে স্বল্প সংখ্যক মানুষের হাতে বিপুল

ধন-সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে।

আর অন্যপ্রান্তে দরিদ্রের বিরাট একটি অংশ দারিদ্রের অভিশাপের বোঝা নিয়ে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামছে। ধনীদের আকাশচুম্বী প্রাসাদের সামনে রমজানে জাকাত প্রদান অনুষ্ঠানে দারিদ্রক্লিষ্ট মানুষের বিশাল সারি এখন নিয়মিত দৃশ্য। জাকাত হল ধনীদের সম্পদে গরীবের অধিকার আদায়ের অনন্য মাধ্যম। জাকাত আদায়ে যেমন পুরস্কার রয়েছে, যথাযথভাবে অনাদায়ে সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণেও রয়েছে চরম শাস্তি।

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন, ‘আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে না, তাদেরকে কঠিন আযাবের সুসংবাদ প্রদান করুন। সেদিন স্বর্ণ ও রৌপ্য জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে। সেদিন বলা হবে, এটাই যা

তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে। সুতরাং তোমরা যা পুঞ্জীভূত করেছিলে তা আস্বাদন কর’ (সুরা তওবা ৩৪ ও ৩৫)।

জাকাত কী?

জাকাত আরবি শব্দ। এর অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্রতা, পরিশুদ্ধি ৷ বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখা যায়, জাকাত দানে সম্পদ কমে যায় ৷ কেননা একশ’ টাকার জাকাত আড়াই টাকা দেওয়ার পর অবশিষ্ট থাকে সাড়ে সাতানব্বই টাকা ৷ তাহলে সম্পদের বৃদ্ধি কোথায়?

মূলতঃ জাকাত দেওয়ার কারণে আল্লাহ তাকে এমন আগাম বিপদ থেকে রক্ষা করেন, যা তার জানা ছিল না ৷ হয়ত সেই বিপদে পতিত হলে অনেক বেশি টাকা তাকে খরচ করতে হতো ৷ জাকাতের অল্প টাকা ব্যয় করে বিরাট অঙ্কের টাকা ব্যয় করা থেকে সে বেঁচে গেল,

এটাই বৃদ্ধি।

জাকাতের প্রয়োজনীয়তা

জাকাতের অংশটুকু সম্পদের ময়লা, এটা বের না করলে পুরো সম্পদ ময়লাযুক্ত হয়ে ব্যবহার অযোগ্য হবে ৷ যেমন কেউ এক হাজার টাকা খরচ করে জামা তৈরি করল, কয়েকবার ব্যবহারের পর জামাটি ময়লা হয়ে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ল ৷ এখন ৮-১০ টাকা খরচ করলে পুরো জামাটা পরিচ্ছন্ন হবে আবার ব্যবহারযোগ্য হবে ৷ এমনিভাবে শতকরা আড়াই টাকা হারে জাকাত দিলে পুরো সম্পদটাই পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হবে এবং ব্যবহারযোগ্য হবে।

মানুষ যদি মনে করে, এত কষ্ট করে অর্থ উপার্জন করেছি, কেন আমি তা থেকে অন্যকে দেব? এ কথা তো অনেকটা ওই ব্যক্তির ভাবনার মতো হবে, যে আঙুর, বেদানা, ফল-ফলাদি ইত্যাদি ভিটামিন জাতীয় অনেক

খেয়েছে। এবার ভাবছে, এগুলো আমি পেট থেকে বের হতে দেবো না ৷ কারণ অনেক পয়সা খরচ করে আমি খেয়েছি ৷ স্বাভাবিকভাবে যখন সে পেট থেকে বের হতে দেবে না, ২৪ কিংবা ৪৮ ঘন্টা পর দেখা যাবে অপারেশন করে হলেও তাকে তা বের করতে হবে।

এমনিভাবে কেউ যদি স্বাভাবিকভাবে জাকাতের অর্থ ব্যয় করতে কার্পণ্য করে, দেখা যাবে আল্লাহ এমন অবস্থা সৃষ্টি করে দেবেন শুধু আড়াই টাকা নয় আড়াই লাখ টাকা তাকে খরচ করতে হবে ৷ তাই সম্পদের মালিককে বুঝতে হবে, জাকাত তার হক নয়, গরীব-মিসকিনের হক ৷ তাদেরকে তাদের হক কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব করে দিয়ে দিতে হবে।

ইসলামি পরিভাষায় জাকাত

ইসলামি পারিভাষায় জাকাত হচ্ছে, মুসলিম বিত্তবানদের (নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক) ধন-সম্পদে আল্লাহ নির্ধারিত সেই অপরিহার্য অংশ, যা সম্পদ ও আত্মার পবিত্রতা, সম্পদের ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং সর্বোপরি আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশায় শরিয়ত নির্ধারিত খাতে ব্যয়-বন্টন করার জন্য দেওয়া হয়।

ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব

ইসলামি শরিয়তে জাকাতের গুরত্ব নামাজের গুরুত্বের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় ৷ কোরআনে কারিমের অধিকাংশ জায়গায় নামাজের সঙ্গে জাকাতের আদেশও দেওয়া হয়েছে ৷ যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা নামাজ কায়েম করো, জাকাত প্রদান করো।’ -সূরা বাকারা: ১১০

হজরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত লাভের পর একদল লোক জাকাত দিতে অস্বীকার করে। হজরত আবু বকর (রা.) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন ৷ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর কসম আমি সেসব লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ গোষণা করব, যারা নামাজ ও জাকাতের মাঝে পার্থক্য করে ৷ নামাজ শরীরের হক আর জাকাত হলো- সম্পদের হক ৷ আল্লাহর কসম কেউ যদি একটি উটের বাচ্চা অথবা একটি উটের রশি জাকাত হিসেবে দিতে অস্বীকার করে যা রাসূলের যুগে দিয়েছিল, আমি তার বিরুদ্ধেও লড়াই করব।’

দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাত

দারিদ্র্য বিমোচনে জাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবি হজরত মুয়াজ (রা.) কে ইয়েমেনে প্রেরণকালে বলেছিলেন, ‘তুমি তাদেরকে জানিয়ে দেবে, আল্লাহ তাদের ওপর জাকাত ফরজ করেছেন, যা ধনীদের নিকট থেকে নেওয়া হবে আর দরিদ্র্যদের মাঝে বন্টন করে দেওয়া হবে।’ আল্লাহ জাকাতের অর্থ ব্যয়ের খাত হিসেবে প্রথমে ফকির-মিসকিনের কথা উল্লেখ করেছেন ৷ এতে বুঝা যায়, দারিদ্র্য বিমোচন জাকাতের মূল লক্ষ্য ৷ আল্লাহ বলেন, ‘তুমি তাদের সম্পদ হতে জাকাত গ্রহণ করো, যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে আর তাদের জন্য দোয়া করো, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য প্রশান্তির কারণ আর আল্লাহ খুব শোনেন, খুব জানেন।’ -সূরা তাওবা: ১০৩

জাকাত না দেওয়ার পরিণাম

কোরআন-হাদিসে জাকাত আদায় না করায় কঠিন শাস্তির কথা ঘোষণা করা হয়েছে ৷ এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ যাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহে সম্পদ দান করেছেন তাতে তারা কৃপণতা করে, (জাকাত আদায় না করে) এটা যেন তারা কিছুতেই কল্যাণকর মনে না করে বরং এটা তাদের জন্য অকল্যাণকর ৷ যাতে তারা কৃপণতা করবে কিয়ামতের দিন তা তাদের গলার বেড়ি হবে।’ -সূরা আলে ইমরান: ১৮০

অন্য আয়াতে আল্লাহতা’য়ালা বলেন, ‘আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জিভূত করে রাখে এবং সেসব আল্লাহর পথে ব্যয় করে না (অর্থাৎ জাকাত আদায় করে না) তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও ৷ সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং এসব দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেওয়া হবে, সেদিন বলা হবে, এটা তোমার সেই সম্পদ যা তুমি পুঞ্জিভূত করে রেখেছিলে ৷ সুতরাং এর শাস্তি আস্বাদন করো ।’-সূরা তওবা: ৩৪-৩৫

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তিকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন আর সে ধন-সম্পদের জাকাত আদায় করেনি সেই সম্পদ কিয়ামতের দিন মাথায় টাক পড়া সাপে পরিণত হবে ৷ এ সাপের দু’চোখের ওপর দু’টি কালো দাগ থাকবে (অর্থাৎ খুবই বিষধর সাপ) ৷ এরপর এ সাপ গলায় বেড়ি হয়ে সেই ব্যাক্তির দুই চোয়াল আকড়ে ধরে দংশন করবে আর বলবে, আমি তোমার মাল আমি তোমার সঞ্চিত সম্পদ।’-সহিহ বোখারি: ২/১০৬

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘কিয়ামতের দিন তোমাদের সম্পদ বিষধর সাপের রূপ ধারণ করবে ৷ মালিক এর থেকে পলায়ণ করবে, সাপ মালিককে খুঁজতে থাকবে ৷ পরিশেষে সে মালিককে পেয়ে যাবে এবং তার আঙ্গুলগুলোকে লোকমা বানিয়ে মুখে পুরবে।’-মুসনাদে আহমদ: ১৩/৫১৩

জাকাত অনাদায়ীর শাস্তির ব্যাপারে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘প্রত্যেক স্বর্ণ ও রৌপ্যের মালিক যে তার হক (যাকাত) আদায় করে না, ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য আগুনের বহু পাত তৈরি করা হবে এবং সে সমুদয়কে জাহান্নামের আগুনে গরম করা হবে। অতঃপর তার পাঁজর, কপাল ও পিঠে দাগ দেওয়া হবে। যখনই তা ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন পূণরায় তাকে গরম করা হবে। সেদিন, যার পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। যতদিন না বান্দাদের বিচার নিষ্পত্তি হয় তার শাস্তি চলমান থাকবে। অতঃপর সে তার পথ ধরবে, হয় জান্নাতের দিকে, না হয় জাহান্নামের দিকে’ (সহিহ মুসলিম)।

অন্যত্র নবীজী ইরশাদ করেছেন, ‘যাকে আল্লাহ তা’আলা সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু সে তার জাকাত আদায় করে না, উক্ত মালকে কিয়ামতের দিন তার জন্য বিষধর সাপে পরিণত করা হবে। যার চোখের ওপর কালো দাগ পড়ে গেছে। অতঃপর তা স্বীয় চোয়ালদ্বয় দ্বারা তাকে কামড় মারবে এবং বলবে আমি তোমার ধনভান্ডার, আমি তোমার সম্পদ’ (সহিহ বুখারী)। নিসাব পরিমাণ স্বর্ণ-রৌপ্য থাকা স্বত্বেও তার জাকাত অনাদায়ের পরিণাম সম্পর্কে হাদিসে পাকে বর্ণিত হয়েছে, ‘একজন মহিলা নবী পাকের নিকট আসলেন, তার সাথে তার মেয়ে ছিল আর মেয়েটির হাতে ছিল স্বর্ণের দুটি মোটা চুড়ি। নবীজি তাকে বললেন, ‘তুমি কি এর জাকাত দাও?’ সে বলল, না। এরপর মহানবী বলেন, ‘তোমাকে কি এটা আনন্দ দিবে যে, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে আগুনের চুড়ি পড়িয়ে দিবেন?’ (আবু দাউদ)।

অন্যত্র হাদিসে পাকে বর্ণিত হয়েছে, হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (র.) বলেছেন, একদা মহানবী আমার নিকট উপস্থিত হয়ে আমার হাতে রূপার বড় বড় আংটি দেখতে পান এবং বলেন, ‘হে আয়েশা! এটা কী? আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনার উদ্দেশ্যে সৌন্দর্য্য বর্ধনের জন্য তা তৈুর করেছি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি এর জাকাত দাও? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তোমাকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট (আবু দাউদ)।

ইসলামী শরীয়তে জাকাত অপরিহার্য একটি বিষয়। যারা জাকাত প্রদানে অস্বীকার করে তারা কাফির হিসেবেই সাব্যস্থ হয়। এজন্যই ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (র.) জাকাত অনাদায়কারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি যেসব লোকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব, যারা নামায ও জাকাতের মাঝে পার্থক্য করবে। কেননা জাকাত হল মালের অধিকার। তারা যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় প্রদত্ত উটের রশিটি দিতেও অস্বীকার করে তবে তাদের এই অস্বীকৃতির কারণে আমি তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই যুদ্ধ করব’।