ক্ষমতার মোহে জাতিয় স্বার্থ ফিকে


অথর
আব্দুর রহমান লাবু   খোলা মতামত
প্রকাশিত :৬ অক্টোবর ২০১৯, ৭:০৯ অপরাহ্ণ
ক্ষমতার মোহে জাতিয় স্বার্থ ফিকে

বিশ^ অর্থনৈতিক ফোরামের ইন্ডিয়ান সামিটে যোগদিয়ে প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা গত ৫ অক্টোবর নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউজে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রি নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির সাথে দ্বিপাক্ষীক বৈঠক করেন।প্রতিবেশি দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রেখে কিভাবে অমিমাংশিত ইস্যুগুলোর আশু সমাধান করা যায় এবং অভিন্ন স্বার্থ সংরক্ষণ করে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাকা গতিশীল করা যায় তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন।দুই প্রধানমন্ত্রির উপস্থিতিতে ৭ টি সমঝোতা স্মারক চুক্তি ও ৩ টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন।চুক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চট্টগ্রাম ও মংলা সমূদ্রবন্দরকে ভারতকে ব্যবহারের সুযোগদান এবং ফেনি নদীর পানি ভারত তাদের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্খিত তিস্তার বিষয়ে এবারও শুধু আশ^াসেই আশ^স্ত থাকতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রি শেখ

হাসিনাকে।সম্প্রতি নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যোগ দিয়ে দুই নেতার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রি এনআরসি(দ্যা ন্যাশলাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন) বিষয়ে নিজেদের উদ্বেগের কথা জানালে বাংলাদেশের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে আশ^স্ত করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি।প্রশ্ন হলো কথা দিয়ে কথা নারাখা মোদির এমন আশ^াসে কী আশ^স্ত থাকা সমীচীন হবে?
কেননা ডিপ্লোম্যাসি বা কূটনীতি পরিচালিত হয় দু’কৌশলে-এক.ডিক্লারেশন ডিপ্লোম্যাসি যা ঘোষনাকেন্দ্রিক দুই.ইম্পিমেন্টারি বা প্রায়োগিক কূটনীতি যা বাস্তবায়নযোগ্য গোপন অভিপ্রায়।তাই মোদির এমন আশ^াস যে শুধুমাত্র ঘোষনার কূটনীতি নয় তা কীভাবে নিশি^ত হওয়া যাবে।কারন ভারততো তিস্তা চুক্তি,সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যাবন্ধ,মাদক পাচার ঠেকানোর আশ^াস বারবার দিয়েও প্রতিপালন কখনই করেনি।এদিকে আসামের রাষ্ট্রহীন নাগরিকদের বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে বিজেপি’র শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই

বাংলাদেশে পুশইন করার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন।এমনও বলেছেন যে কথিত অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে হিন্দুরা যদি মঙ্গল গ্রহ থেকেও আসে তবুও তাদের জন্য ছাড় দেওয়া হবে।একথা স্পষ্ট যে বাদপড়া হিন্দুদের নাগরিকত্ব প্রদানে তারা আন্তরিক।ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রি ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ গত মাসে কলকাতা সফরে গিয়ে বলেছিলেন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টানদের নাগরিকত্ব প্রদানে প্রয়োজনে নাগরিকত্ব আইন সংস্কার করবে।এতে প্রতীয়মাণ যে এনআরসি তালিকা থেকে বাদপড়া মুসলিমদের হয় বাংলাদেশে পুশইন করবে অথবা নির্মিতব্য বন্দিশিবিরে বন্দি করে রাখবে পুশইন না করা পর্যন্ত।মুসলিমদের তাড়াতে সমগ্র ভারতজুড়েই এনআরসি’র কার্যক্রম পরিচালনা করার কথাও অমিত শাহ বলেছেন এবং কর্ণাটকে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে এনআসির কার্যক্রম ও বন্দিশিবির নির্মাণের কাজ।ওদিকে পশ্চিমবঙ্গ বিহার উত্তর

প্রদেশসহ বেশকটি অঙ্গরাজ্যের বিজেপির বিধায়ক বা মূখ্যমন্ত্রিরা এনআরসি কার্যক্রম পরিচালনার প্রকাশ্য ঘোষনা দিয়ে রেখেছে।যদিও তৃনমুল সভাপতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রি মমতা ব্যানার্জি এনআরসি ঠেকানোর চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।ওদিকে কট্টর হিন্দুত্ববাদি সংগঠণ রাষ্ট্রিয় সেবক সংঘের(আরএসএস)প্রধান মোহন ভাগবত বলেছেন ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতকে মুসলিম শূণ্যকরে হিন্দুস্তান কায়েম করা হবে।তাই দিল্লির এনআরসি ইস্যুতে আশ^াসে আশ^স্ত নাথেকে প্রয়োজনে আসাম সীমান্তে আগাম সতর্কমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বাংলাদেশকে।
এশিয়ার অন্যতম আ লিক শক্তি বড় অর্থনীতির দেশ ভারত আমাদের বন্ধু প্রতিম প্রতিবেশি রাষ্ট্র। মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান প্রনিধাণযোগ্য। তাছাড়া বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত বাংলাদেশ ভৌগোলিক ভাবে খুবই গুরত্ব¡পূর্ণ। সেই জন্য অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে শুধু এশিয়া নয়,বরং উন্নত দেশগুলোরও নজর রয়েছে

বাংলাদেশের উপর। বর্তমান সরকার প্রথমধাপে ক্ষমতায় এসে ভারতের সাথে গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি করেছিল যদিও চুক্তি অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা আমরা পাচ্ছিনা । এছাড়া তিস্তা চুক্তি না হওয়ায় বাংলাদেশের উত্তরা ল দিন দিন মরুভুমিতে পরিণত হচ্ছে,মঙ্গাপীড়িত জনগোষ্ঠী দারিদ্রের যাঁতাকলে হচ্ছে।২০১১ সালে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তখন চুক্তি বিষয়ে আশায় বুক বেধে ছিল বাংলাদেশের জনগণ। সেই সফরে সফর সঙ্গী হওয়ার কথা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জিরও। কিন্তু শেষঅবধি পার্শ্ববর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর মূখ্যমন্ত্রীরা এলেও মমতা ব্যানার্জি না আসায় সেই আশায় গুড়েবালি হয়েছিল। বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়েও আবার আশা দেখেছিল এদেশের জনতা। কিন্তু তখনও শুধু চুক্তি বিষয়ে আশ্বাস পেয়েছিল বাংলাদেশ। এবারেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে মিলেছে শুধুই আশ্বাস।
এদিকে গঙ্গা নদীর ওপর ভারত কর্তৃক অনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইন অমান্য করে দেয়া ফাঁরাক্কা বাধের ১১৯ টি গেট খুলে দেয়ায় বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশের মধ্যা ল ও দক্ষিণ-পশ্চিমা ল।পানিবন্দি হয়ে দূর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছে বানভাসি মানুষ সেইসাথে নদী ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে দেশের বিস্তির্ণ এলাকা।এইযে নদী প্লাবিত হয়ে আমরা ডুবে মরছি আবার শুকনো মৌসুমে শুকিয়ে মরছি এর দায় কার?আমাদের যেমন দায় রয়েছে তেমনি সিংহভাগ দায় বর্তায় প্রতিবেশি দেশ ভারতের ওপর।বৈশি^ক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এমনিতেই গোটা হিমালয়ান ড্রেইনেজ ইকোসিস্টেম আজ হুমকীর মুখে।সেই সাথে হুমকিতে পড়েছে অ্যাগ্রো ইকোলজি,পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র।ভৌগোলিক অবস্থানগত কারনে উজানের দেশ ভারত হয়েই ৫৪ টি আন্তর্জাতিক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে,তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন করা,সীমান্ত হত্যা বন্ধ,এনআরসি ইস্যুতে স্পষ্ট অবস্থান ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন আদায়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে । কেননাতথাকথিত বন্ধু ভারতকে উজার করে দিয়েও বন্ধুর মন পাইলামনা।বন্ধু হয়ে বন্ধুর বুকে গুলি করবে তা মেনে নেয়া যায়না।আমরা ট্রানজিট দিয়ে স্বাধীনতাকামি ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত অঙ্গরাজ্যগুলোর ব্যাপারে ভারতকে নিশ্চিন্ত করেছি।আসামের উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে হস্তান্তর করে বিচ্ছিন্নাবাদি সংগঠণগুলোর দৌরাত্মবন্ধে সহযোগিতা করেছি।ইচ্ছে করলে এই ট্রার্ম কার্ডটি ব্যবহার করেই আমরা ভারতের সাথে বিদ্যমান অমীমাংশিত ইস্যুগুলোর দৃশ্যমান সমাধান করতে পারি।তাদের পণ্য দেশের বাজারে সয়লাব করার সুযোগ দিয়ে বাণিজ্য ঘাটতি ৮ বিলিয়ন ডলারে এনেছি।তারা পানির ন্যায্য হিস্যা নাদিলেও নতুনকরে আমরা ফেনি নদীর পানি দিচ্ছি ও দুটি সমূদ্রবন্দরকে ব্যবহারের সুযোগ,কাশ্মির ইস্যুতে সমর্থন,তরল গ্যাস,পূজা উপলক্ষে দেশের মানুষকে বি ত করে ইলিশ উপহার দিয়েছি। এতকিছু দেয়ার পরও তথাকথিত বন্ধুর মন পাচ্ছিনা ।বিনিময়ে পেঁয়াজ দেয়া বন্ধ,রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভোট দেয়া,ফারাক্কার গেট খুলে দিয়ে ডুবিয়ে মারছে,তিস্তার চুক্তির মুলা ঝুঁলিয়ে রাখা,সীমান্তে হত্যা ও মাদক পাঠিয়ে যুবসমাজকে ধ্বংস করছে।যাইহোক দেশের স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখতে ও জাতিয় স্বার্থ হাসিলের কূটনীতিতে সরকার মনোযোগি হবে এমনটাই প্রত্যাশা করে দেশের মানুষ। লেখক-শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক