ক্ষুধা থেকে অতিপুষ্টি


অথর
শিক্ষক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :৮ এপ্রিল ২০১৯, ৫:৪২ পূর্বাহ্ণ
  • 80
    Shares
ক্ষুধা থেকে অতিপুষ্টি

মানুষ ‘বাঁচার জন্য খায়’ নাকি ‘খাওয়ার জন্য বাঁচে’ প্রশ্ন দুটি এখন নতুন মাত্রা লাভ করেছে। কারণ পুষ্টিহীনতার পর্ব শেষ না হতেই নতুন পর্ব দৃশ্যমান। গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘অতিপুষ্টি’। জাতিসংঘের তথ্য মতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে আক্রান্ত। ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে বিশ্বে প্রতি পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ডে একজন করে শিশু মারা যাচ্ছে। এর বিপরীতে ২০০ কোটি মানুষ ‘অতিরিক্ত পুষ্টিতে’ ভুগছে! বিশ্বে প্রতিবছর ‘অতি পুষ্টির’ কারণে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হচ্ছে!

খাদ্য কি?

যেসব জৈব উপাদান জীবের দেহ গঠন, ক্ষয়পূরণ এবং শক্তি উৎপাদনে ব্যবহূত হয় সেগুলোকে খাদ্য বলে। অর্থাৎ দেহের কাজকর্মসুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে দেহকে সুস্থ, সবল করার জন্য যেসব

খাদ্য উপাদান প্রয়োজন সেসব উপাদানকেই খাদ্য বলা হয়। শরীরের যথাযথ বৃদ্ধি সাধন এবং শরীরকে সবল রাখার জন্য সঠিক পরিমাণে উপযুক্ত খাবার খাওয়া খুবই জরুরী। কারণ খাদ্য দেহের গঠন, বৃদ্ধি সাধন, ক্ষয়পূরণ, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মশক্তি প্রদান এবং রোগ প্রতিরোধের কাজ করে। খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা অর্জন করা দেহকে সুস্থ রাখার পূর্বশর্ত। খাদ্য দেহের পুষ্টিসাধন করে। প্রতিদিন একজন মানুষের কতটুকু খাবার গ্রহনের প্রয়োজন তা নির্ভর করে মূলত বয়স, দেহের উচ্চতা ও দেহের ওজনের ওপর। তবে বেশি শারীরিক পরিশ্রম করলে বেশি শক্তি প্রয়োজন। বয়স অনুপাতে সঠিক উচ্চতা ও ওজন নেই যাদের এবং কাজের জন্য যারা যথেষ্ট শক্তি পায় না তারা মূলত পুষ্টিহীনতায়

ভুগে।

পুষ্টি কি?

যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় জীব খাদ্যবস্তু গ্রহণ, পরিপাক, পরিশোধন ও আত্তীকরণের মাধ্যমে দেহের ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধি সাধন ও শক্তি উৎপাদিত হয় তাকে পুষ্টি বলে। অর্থ্যাৎ খাদ্য উপাদান যে প্রক্রিয়ায় শরীরের তাপ ও শক্তি জোগায়, দেহের গঠন, বৃদ্ধি ও ক্ষয়পূরণ করে এবং শরীরকে সবল ও রোগমুক্ত রেখে কর্মক্ষম জীবনযাপনে সহয়তা করে তাই হলো পুষ্টি।

অপুষ্টি কিঃ

প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি খাবার খেলে তা শরীরকে অসুস্থ করে তোলে। একেই বলে অপুষ্টি। উন্নয়নশীল দেশে অপুষ্টি বলতে পুষ্টিহীনতা অর্থাৎ প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাবকে বোঝায়।

এবার দুটি চিত্র দেখি। একদিকে ক্ষুধা পবো। অন্যদিকে অতিপুষ্টিও মিলবে। দুটোই ভয়ানক এই সময়ে।

প্রথম চিত্র:

২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবরে একটি সর্তকবাণী দেয় জাতিসংঘ। ক্ষুধা,

জলবায়ু পরিবর্তন এবং মনুষ্য সৃষ্ট সংঘাতের সংযোগে তৈরি হওয়া বড় সংকট বিশ্ববাসীর দিকে ধেয়ে আসছে বলে সতর্ক করে দেয় জাতিসংঘের খাদ্য বিষয়ক সংস্থা। রোমে সংস্থার সদর দফতরে দেওয়া এক ভাষণে এই সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান ডেভিড বেসলি। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ার জাতিসংঘের লক্ষ্য বাস্তবায়ন তিনটি বাধার মুখোমুখি হচ্ছে। এগুলো হলো সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক ধ্বস। বেসলি বলেন, ‘আপনাদের জন্য আতঙ্কজনক খবর হচ্ছে বড় সংকট ধেয়ে আসছে’। এ থেকে উত্তরণে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এছাড়া গত বছরের ৮ অক্টোবর জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে সতর্ক করে দিয়ে

বলে, কার্বন নিঃসরণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ১২ বছরের মধ্যে পৃথিবীতে খরা,বন্যা আর ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মতো মহাবিপর্যয় নেমে আসতে পারে। উষ্ণতা বৃদ্ধির বিপর্যয়পূর্ণ এই মাত্রার লাগাম টেনে ধরতে‘সমাজের সবক্ষেত্রে দ্রুত,বহুদূরপ্রসারিত ও নজিরবিহীন পরিবর্তন’র অপরিহার্যতা তুলে ধরে জাতিসংঘ প্যানেল। এছাড়া বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলছে যুদ্ধের বাস্তবতা। অর্থনৈতিক সংকট ও যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচতে অভিবাসী হচ্ছে বিপুল মানুষ।

এমন বাস্তবতায় জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার প্রধান জানান, ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে বিশ্বে প্রতি পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ডে একজন করে শিশু মারা যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বিশ্বে খাদ্য অপচয় নিয়েও সতর্কতা দেন তিনি। বেসলি জানান, উৎপাদন প্রক্রিয়া ছাড়াও মানুষের রান্নাঘরেও থাবার অপচয় হচ্ছে। স্রোতাদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘উত্তর শুধু রোমে নয় আপনাদের বাড়িতেও আছে। এটা নিয়ে আপনারা কি ভাবছেন’?

বেসলি বলেন, ‘ধনী দেশগুলোর সহজে এড়িয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা এটা নয়, অভিবাসী সংকট হয়ে এটা তাদের দরজায় কড়া নাড়ছে’। তিনি বলেন, ‘বিশ্বে প্রতি এক শতাংশ ক্ষুধা বাড়লে অভিবাসী বাড়ছে দুই শতাংশ’।

জাতিসংঘের সর্বশেষ ক্ষুধা রিপোর্ট বলছে, গত বছর বিশ্বে ৮২ কোটিরও বেশি মানুষ বা প্রতি নয়জনে একজন ক্ষুধায় ভুগেছে। এনিয়ে পরপর তিন বছর ক্ষুধায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়লো।

দ্বিতীয় চিত্র:

বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মতে বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১৫ কোটি ৫০ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে। আর পুষ্টির সংগায় পরিবর্তন এনে ‘গোপন ক্ষুধা’র হিসাব ধরলে বিশ্বের ২০০ কোটি মানুষ এর আওতায় পড়বে। তবে আশংকার কথা এই যে, বর্তমানে বিশ্বের ৬ কোটি মানুষ মোটা হওয়া জনিত সমস্যায় (স্থুলতা) ভুগছে। এফএও’র প্রধান জোস গ্রাজিয়ানো দ্য সিলভা বলেন, বিশ্বজুড়ে স্থুলতার সমস্যার ব্যয় সশস্ত্র সংঘাত ও ধুমপানের মতোই ব্যয়বহুল।

গত ৪ এপ্রিল এএফপি’র এক খবরে বলা হয়, অতি পুষ্টির কারণে মারা যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ! বিশ্বে প্রতিবছর ‘অতি পুষ্টির’ কারণে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। ল্যানসেট চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণার ফলাফলে এ কথা জানানো হয়েছে। এতে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেন, ‘অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও মাংস খাওয়ার কারণেই কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে প্রতিবছর।’

জাতিসংঘের তথ্য মতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ অপুষ্টিতে আক্রান্ত। এর বিপরীতে ২০০ কোটি মানুষ ‘অতিরিক্ত পুষ্টিতে’ ভুগছে।
প্রকাশিত গবেষণা থেকে দেখা যায়, ১৯৫টি দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষই প্রতিদিন ভুল ধরনের খাবার খাচ্ছে। একই সঙ্গে তারা না বুঝে স্বাস্থ্যকর খাবারও ভুলভাবে গ্রহণ করছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশ্বে প্রতিটি মানুষের গড়ে যে পরিমাণ চিনি খাওয়া প্রয়োজন এর চেয়ে ১০ গুণ বেশি চিনি তারা মিষ্টিজাতীয় খাবারের মাধ্যমে শরীরকে দিচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি মানুষের জন্য যতটুকু লবণ খাওয়াকে নিরাপদ মনে করা হয় এর চেয়ে ৮৬ গুণ বেশি লবণ তারা গ্রহণ করছে।

১৯৯০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত খাদ্যাভ্যাস ও নানা ধরনের রোগবালাইয়ের প্রবণতার ওপর করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, খুব অল্পসংখ্যক মানুষই সুস্থ জীবনধারা বজায় রাখতে পারছে। আর এ জন্য তারা প্রতিদিন দানাজাতীয় খাদ্য, ফলমূল, বাদাম ও বীজজাতীয় খাবার খাচ্ছে।

এদিকে স্থূলতার কারণে হৃদেরাগে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মারা গেছে এক কোটি ১০ লাখ মানুষ। গবেষণাটির লেখক ও ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের পরিচালক ক্রিস্টোফার মুরে বলেন, ‘যেকোনো ধরনের শারীরিক হুমকির চেয়েও ভুলভাবে খাদ্যগ্রহণ বিশ্বে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটাচ্ছে বলে যে ধারণা অনেক বছর ধরে মানুষের মধ্যে বিদ্যমান ছিল তারই প্রমাণ এই গবেষণা।’

এই ‘অতিপুষ্টি’জনিত বিপদ দূর করার মহৌষধ আছে আমাদের মাঝেই। নাম ‘পরিমিত খাদ্যাভাস’। খাদ্যাভাস যদি সঠিক না হয় তাহলে অন্যকিছুতেই শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

লেখক: ফজলুর রহমান, সহকারী রেজিস্ট্রার (সমন্বয়), ভাইস চ্যান্সেলর অফিস, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)। F