টার্গেট কিল কিম নীতিতেই বেপরোয়া কোরিয়া


আব্দুর রহমান লাবু
অথর
পাঠক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :২৮ আগস্ট ২০১৯, ৬:১৬ অপরাহ্ণ | পঠিত : 102 বার
টার্গেট কিল কিম নীতিতেই বেপরোয়া কোরিয়া

একবিংশ শতকের বিশ্বায়নের যুগে ক্রমশ প্রকট আকার ধারণ করছে সভ্যতার সঙ্ঘাত। অর্থনৈতিক উচ্চাশা ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় পরাশক্তির দেশসমূহের দাবার গুটিতে পরিনত হচ্ছে নির্ভরশীল অর্থনীতির দেশগুলো।পশ্চিমা বিশে^র শিল্পোন্নত দেশগুলো তেলভান্ডার লুটতে ও অস্ত্র ব্যবসার নিমিত্তে একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ জিইয়ে রেখেছে।অপরদিকে বাণিজ্যিক যুদ্ধ- স্নায়ুযুদ্ধ চলমান রেখে বলির পাঠায় পরিনত করছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোকে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব কমে যাওয়ায় পশ্চিমা বিশে^র নজর এখন পড়েছে দূরপ্রাচ্যে । মার্কিন প্রশাসন চাইছে স্থিতিশীল এশিয়াকে অস্থিতিশীল করে চীন-রাশিয়ার প্রভাব কমিয়ে এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য পোক্ত করতে।কিন্তু সেই লক্ষ্য পূরণের পথে বড় বাধা হয়ে প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তুলে রেখেছে চীন ও উত্তর কোরিয়া।তাই কোরিয় উপদ্বীপকে অশান্ত করতে সেই ১৯৫০ সাল

থেকে তৎপরতা চালিয়ে আসছে হোয়াইট হাউজ।উভয় কোরিয়ার মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষ সামরিক সহযোগিতা করেছিল দক্ষিণ কোরিয়াকে।ঠিক তখন থেকেই কোরিয়া ও আমেরিকার মধ্যে পারস্পরিক অবিশ^াস দানা বাধে। এদিকে আদর্শিক মিল ও বাণিজ্যিক স্বার্থে চীন রবাবরই উত্তর কোরিয়ার পাশে থেকেছে।আবার চীনের অকৃত্রিম বন্ধু রাশিয়ার অস্ত্র আমদানিকারন দেশের মধ্যে উত্তর কোরিয়া অন্যতম।তাই কোরিয় ইস্যুতে রাশান পররাষ্ট্রনীতিও চীন অনুসৃত।অন্যদিকে এশিয়ায় কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সহযোগী হিসেবে আমেরিকা বেছে নিয়েছে অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে।
অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান কোরিয় ইস্যুতে দ্বৈতনীতির অনুসরন করছে মার্কিন প্রশাসন।এক.একদিকে স্বপ্ন দেখাচ্ছে যে,পরমাণু কর্মসূচি প্রত্যাহার করলে উত্তর কোরিয়ার সোনালি ভবিষ্যত গড়ে দেবে যুক্তরাষ্ট্র।দুই.পরমাণু কর্মসূচিতে পিছু না হটলে সামরিক পদক্ষেপে ধ্বংস

করে দেওয়া হবে।কিন্তু মার্কিন মূলুকের মধু খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে বিষ খাওয়ানোর প্রবণতা কারো অজানা নয়।আমরা জানি মার্কিন স্বার্থবিরোধী অনেক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে তারা সরিয়ে দিয়ে তাবেদার সরকার বসিয়ে স্^ার্থ হাসিল করেছিল।উদাহরনস্বরুপ ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার গাদ্দাফি সরকারের পতনের প্রসঙ্গটি প্রণিধানযোগ্য।আবার তাদের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর মাধ্যমে তারা গোপন মিশন চালিয়ে অনেক দেশের শাসককে সরাতে সর্বদাই তৎপর রয়েছে।ইরানের স্বাধীন সরকারকে হটিয়ে শাহ সরকারের পত্তন।কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে সরাতে বারবার হামলা করেও সফল না হওয়ার ইতিহাস সকলেরই জানা।গাদ্দাফি মার্কিন প্রশাসনের চতুরতার ফাঁদে পড়ে পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করার অল্পদিনের মধ্যেই গাদ্দাফির পতন হয়।তাই কোরিয়া যে লিবিয়ার পথ অনুসরন করবেনা তা বলাবাহুল্য।বরং

চীন-রাশিয়ার পরোক্ষ মদদে ও সহায়তায় উত্তর কোরিয়া পরমাণু কর্মসূচি চলমান রাখবে এটাই সত্য ।
পারস্পরিক উস্কানি ও অব্যাহত যুদ্ধ হুমকির মধ্যেই চলতি বছরের ফেব্রæয়ারীতে পরমাণু ইস্যুতে ভিয়েতনামে মিলিত হয়েছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ট ট্রাম্প ও কোরিয় নেতা কিম জং উন।সেই সংলাপে সমাধান নাহলেও উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছিল এশিয়সহ বিশ^পরিমন্ডলে।আবার উত্তর কোরিয় নেতা কিম জং উন ও দক্ষিণ কোরিয় নেতা মুন জে উনের মধ্যকার শান্তি আলোচনায় শান্তির আশা জেগেছিল বিশ^বাসীর বুকে।কিন্ত বিধিবাম শান্ত কোরিয় উপদ্বীপ মার্কিন প্রশাসনের ভুল পদক্ষেপে আবার নতুনকরে অশান্ত হওয়ার পথে। সম্প্রতি আমেরিকা-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ায় সেই ছাই চাপা আগুন যেন আবার জ¦লতে শুরু করেছে।উত্তর কোরিয়ার

নতুনকরে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে শান্তি আলোচনা নাকচ করায় যুদ্ধাশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান।এমন বিপদজনক পরিস্থিতিতে নিরাপদ এশিয়ার স্বার্থে কূটনৈতিক উদ্যোগ জরুরী হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকগণ ।

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে কিম প্রশাসন দুরপাল্লার হাইড্রোজেন বোমাসমৃদ্ধ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জেরে মার্কিনি চাপে নিরাপওা পরিষদ কোরিয়ার ওপর ষষ্ঠবারের মতো অর্থনৈতিক অবরোধ জারি করেছিল ।তবে চীন-রাশিয়ার মধ্যস্থতায় আরোপিত অবরোধ কঠোরতার পরিবর্তে ছিল অনেকটাই নমনীয়। কিন্তু অর্থনৈতিক অবরোধ-নিষেধাঙ্গা উত্তর কোরিয়া যে থোরাই কেয়ার করে তা আগেই প্রমাণিত হয়েছে।যেমনটা বলেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন,নিজদেশের অস্থিত্ব রক্ষায় উত্তর কোরিয়া ঘাস খেয়ে থাকবে তবু পরমাণু কর্মসূচী থেকে পিছু হটবে না।কেননা দূরপ্রাচ্যে মার্কিন আগ্রাসন নীতি,চিরবৈরী প্রতিবেশিদেশ জাপান-দঃকোরিয়ার হাত থেকে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের সক্ষমতা অর্জন করেছিল।দ্বিতীয় বিশ^ যুদ্ধের পর বিভক্ত কোরিয়ার মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে(১৯৫০-১৯৫৩) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল প্রত্যক্ষ সামরিক-অর্থনৈতিক সহযোগিতা করেছিল দঃকোরিয়াকে।সেসময় ভারত-জাপানও সমভাবে সমর্থন দিয়েছিল দঃকোরিয়াকে।সে যুদ্ধে চীন-রাশিয়াকে পাশে পেয়ে স্বার্বভৈামত্ব টিকিয়েছিল উঃকোরিয়া। যুদ্ধ পরবর্তীতে দঃকোরিয়া ও জাপানে সামরিক ঘাটি স্থাপন করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।লক্ষ্য উঃকোরিয়াকে নিশ্চিহৃ করে আধিপত্য বাড়িয়ে চীনসহ এশিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করা।তখন থেকেই নিজ ভূখন্ড রক্ষা করতে চীন-রাশিয়ার পরোক্ষ সহযোগীতায় পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের কাজে হাত দেয় উঃকোরিয়া।অব্যাহত পশ্চিমা হুমকী ধামকিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে প্রথমবারের মতো ২০০৬ সালে পরমাণু বোমার পরীক্ষা চালিয়ে পারমাণমিক শক্তিধর দেশের তালিকায় নাম লেখায় উত্তর কোরিয়া।ঠিক তখন থেকেই কোরিয় ইস্যুতে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ব্যাপক পরিবর্তন আসে।ডোনাল্ট ট্রাম্প প্রশাসনের জাতিয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা যুদ্ধবাজ নেতা জন বোল্টন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রি মাইক পম্পেও চাইছে উত্তর কোরিয়ায় সামরিক পদক্ষেপ।উভয়ের ভুল পরামর্শে ট্রাম্প র‌্যাপিড সিদ্ধান্ত নিয়ে আক্রমণ করলে তৃতীয় বিশ^যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবি হয়ে উঠবে বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বোদ্ধাগণ।তাই কোরিয় সংকটকে উস্কে দেয় এমন কর্মকান্ড থেকে উভয় দেশকে বিরত থেকে কূটনৈতিক পথে হাটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
এদিকে এশিয়ায় ট্রাম্প এর আধিপত্য খর্ব করতে উত্তর কোরিয়াকেই ট্রাম্প কার্ড হিসেবে বেছে নিয়েছে চীন-রাশিয়া।তাই উত্তর কোরিয়াকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভাবে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে উক্ত দুই বন্ধু প্রতীম দেশ।তাছাড়া কিম জং উনও ভালো করেই জানেন যতদিন চীন-রাশিয়া পাশে আছে ততদিন তাদের ভূখন্ডে হামলা চালানোর সাহস পাবে না মার্কিন প্রশাসন।কেননা সমাজতান্ত্রিক আদর্শিক ও নির্ভরযোগ্য সহযোগী চীন-রাশিয়ার কাছ থেকেই উত্তর কোরিয়া অস্ত্র আমদানি করে।আবার উত্তর কোরিয়ার জ¦ালানি চাহিদার নব্বই শতাংশ তেল রপ্তানি করে চীন। উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম খাত হলো বস্ত্র-বয়ন শিল্প জাত পণ্য রপ্তানি ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স।যাইহোক কোরিয় নেতার অব্যাহত যুদ্ধের হুমকি এবং ৪৫ শত কিলোমিটার দূরত্বে আঘান হানতে সক্ষম হোয়াসন-১০ হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষা চালানোয় ঘুম হারাম হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের।আর নিরাপত্তা হুমকিতে ভূগছে মার্কিনিদের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া-জাপান-ভারত।

সম্প্রতি লন্ডন ভিত্তিক পত্রিকা টাইমস, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা দপ্তরের বরাত দিয়ে জানিয়েছে,মার্কিন নৌ বাহিনীর দুর্ধর্ষ কমান্ডো বাহিনী নেভি সিল এখন উত্তর কোরিয়ার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী কিম জং উনকে হত্যার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে।সেই গোপন মিশনের নাম দেওয়া হয়েছে-টার্গেট কিম কিল।যেভাবে এর আগে নেভি সিলের সদস্যরা আল কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে হত্যা করে সাগরের পানিতে ল্শা ভাসিয়ে দিয়েছিল।যদি তাই হয় তবে উত্তর কোরিয়া আরো বেপরোয়া হয়ে লাগামহীন আচরন করবে যা যুদ্ধ আশঙ্কা সত্যিতে পরিনত করতে পারে।যাইহোক মার্কিন-কোরিয়ার অব্যাহত হুমকী এশিয়ায় পরমাণু প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দেবে নিঃসন্দেহে। নিরাপত্তার স্বার্থে দক্ষিণ কোরিয়া- জাপান এখন পরমাণু সক্ষমতা অর্জনে মনোযোগ দেবে ও সামরিক শক্তি বাড়াতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে।ইতিমধ্যেই দক্ষিণ কোরিয় প্রেসিডেন্ট মুন জে উন ও জাপানের প্রধানমন্ত্রি শিনজো আবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র আমদানি করতে পার্লামেন্টের সমর্থন নিয়ে অস্ত্রভান্ডার সমৃদ্ধ করার কাজে মনোনিবেশ করেছে।এহেন অবস্থায় উত্তরকোরিয়া যে তাদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ও পরমাণু সমৃদ্ধকরন কার্যক্রম জোড়দার করবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।আর এতে করে আবারো অশান্ত হয়ে উঠতে পারে কোরিয় উপদ্বীপ।তাই এশীয়অ লের আ লিক নিরাপত্তার স্বার্থে এবং বিশ^কে তৃতীয় বিশ^যুদ্ধের হাত থেকে বাঁচাতে কূটনৈতিক সমাধানই কাম্য।

লেখকঃ কলেজ শিক্ষক-সংবাদকর্মী