ডলার সঙ্কট ॥ আমদানি বেড়েছে ব্যাপক হারে


অথর
অর্থনৈতিক ডেক্স   ব্যবসা বানিজ্য
প্রকাশিত :৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 62 বার
ডলার সঙ্কট ॥ আমদানি বেড়েছে ব্যাপক হারে

বাজারে চাহিদা ও যোগানের ব্যবধানের কারণে ডলারের সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে। এতে টাকার মান কমে যাচ্ছে। বাড়ছে ডলারের দাম। বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার ছেড়েও পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারছে না। ব্যাপকহারে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় এমন অবস্থা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা। সময়মতো প্রয়োজনীয় পণ্য আনতে না পারায় খরচ বাড়ছে ব্যবসায়। এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটের মধ্যেই ডলার বিক্রি নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকসহ ৯ ব্যাংক বেশি দামে নগদ ডলার বিক্রি করেছে। ডলারের এ ধরনের মূল্য বৃদ্ধিকে কারসাজি বলছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, রেমিটেন্স ও রফতানি বাড়লে ডলারের

দাম কমার কথা। কিন্তু উল্টো বাড়ছে।

জানা গেছে, বৈদেশিক বাণিজ্য ডলারের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। ব্যাংকগুলো গ্রাহকের পক্ষে ডলার আয় ও ব্যয় করে। আমদানির ক্ষেত্রে ডলার খরচ হয়। রফতানি ও রেমিটেন্সের মাধ্যমে ডলার আয় হয়। যেসব ব্যাংকের আয় কম কিন্তু ব্যয় বেশি তারা ডলার কিনে থাকে। প্রথমত কিনে অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে, সেখানে না পেলে পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বারস্থ হয়। সরকারী ব্যাংক বৈদেশিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যে অনেক পিছিয়ে। মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ৭ ভাগ হয় সরকারী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। রেমিটেন্স সংগ্রহের শীর্ষেও বেসরকারী ব্যাংক। সরকারী কিছু বড় প্রকল্পে অর্থায়ন করছে সরকারী ব্যাংক। এজন্য তাদের ডলারের চাহিদা বাড়ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে,

বাংলাদেশ ব্যাংক যে ডলার বিক্রি করেছে তার প্রায় সবই কিনেছে সরকারী ব্যাংকগুলো। সরকারের উন্নয়ন কাজের অর্থের জোগান দিতে ডলার কেনা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকারী ব্যাংকগুলো। ঋণ বিতরণ করে তহবিল শূন্য করে ফেলেছে বেসরকারী ব্যাংকগুলো। অধিকাংশ ব্যাংকই ঋণের আইনী সীমা লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে ঋণ বিতরণ একপ্রকার বন্ধই রেখেছে সরকারী ব্যাংকগুলো। তবে দেশের ভেতরে ঋণ বিতরণ বন্ধ থাকলেও বৈদেশিক বাণিজ্যে অর্থ বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে সেভাবে ডলার আয় করতে পারছে না। কিন্তু ব্যয় বাড়ছেই। এতে ব্যয়ভার বহন করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনতে হচ্ছে সরকারী ব্যাংকগুলোকে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটের মধ্যেই ডলার বিক্রি নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ

প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকসহ ৯টি ব্যাংক বেশি দামে নগদ ডলার বিক্রি করেছে।

নগদ ডলার বিক্রি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ১৯ আগস্ট শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক নগদ ডলার বিক্রি করেছে ৮৬ টাকা ৫০ পয়সায়। একই দিন ৮৬ টাকা ২০ পয়সা দরে নগদ ডলার বিক্রি করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংক ও বিদেশী ব্যাংক আল ফালাহ। ৮৬ টাকা ১৫ পয়সা দরে নগদ ডলার বিক্রি করেছে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক। এছাড়া ৮৬ টাকা দরে নগদ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক নগদ ডলার বিক্রি করেছে ৮৬ টাকা ৪৫ পয়সা দরে। একইদিন ৮৬ টাকা ৩০ পয়সা দরে নগদ ডলার বিক্রি করেছে আইসিবি

ইসলামিক ব্যাংক। এর বাইরে ৮৬ টাকার নিচে কিন্তু ৮৫ টাকা ৫০ পয়সার উপরে বিক্রি করেছে আরও ১০টি ব্যাংক। এভাবে নগদ ডলার বিক্রিতে অসুস্থ প্রতিযোগিতা করছে ব্যাংকগুলো। ডলার সঙ্কট বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জনকণ্ঠকে বলেন, আগের বছরে ব্যাপকহারে আমদানি হওয়ায় এখন ডলার সঙ্কট হচ্ছে। ওই সময়ে রফতানির চেয়ে আমদানি অনেক বেশি ছিল। তবে বর্তমানে রেমিটেন্স ও রফতানির আয় ভাল হচ্ছে। এতে ডলারের সঙ্কট কমার কথা। কিন্তু উল্টো বাড়ছে। এতে ডলারে কারসাজি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। এজন্য বৈদেশিক মুদ্রার বাজার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন ড. মোয়াজ্জেম।

এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেনÑ রফতানি, রেমিটেন্স আয়ের সঙ্গে আমদানি ব্যয়ের একটা অসামঞ্জস্য হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে। এর ফলে দাম বেড়ে যাচ্ছে। আর চাহিদা অনুযায়ী ডলারও দিতে পারছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ খান বলেন, ব্যাংকগুলো প্রচুর পরিমাণে এলসি (ঋণপত্র) খুলে রেখেছে। সেগুলোর সেটেলমেন্ট করার জন্য প্রচুর ডলারের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে অনেকক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলো বেশি দামে ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্যে ব্যাংক লাভের বদলে ক্ষতিতে পড়ছে।

সূত্র জানায়, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরজুড়ে ব্যাংক খাত তারল্য সঙ্কটে ভুগেছে। আর এই তারল্য সঙ্কট তীব্র করেছে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ডলার ক্রয়। আমদানির চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলো প্রায় প্রতিদিনই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনেছে। সব মিলিয়ে গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৩৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। কোন একক অর্থবছরে এটি ছিল সর্বোচ্চ অঙ্কের ডলার বিক্রির রেকর্ড। ২০১৭-১৮ অর্থবছর বিক্রি করেছিল ২৩১ কোটি ১০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, রফতানি আয় ও রেমিটেন্স-প্রবাহ বেশি থাকায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আগ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনেছে। ওই সময় সরবরাহ বেশি থাকায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়ে যেতে থাকে। তাই সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে বিনিময় মূল্য স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনেছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪১৩ কোটি ডলার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কেনা হয় মাত্র ১৯৩ কোটি ডলার। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে ডলার সঙ্কট শুরু হয়। ওই বছরে বৈধপথে রেমিটেন্স আসা কমে যায়। হুন্ডির মাধ্যমে রেমিটেন্স আসতে থাকে। রফতানি আয়ও তখন কমে যায়। অন্যদিকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজ চলছে। এখন রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প, মেট্রোরেল, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্প একসঙ্গে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে ব্যয় হচ্ছে অনেক ডলার।

সূত্র আরও জানায়, গত বছর ডলার কিনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খরচ হয়েছে ১৯ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা)। আগের বছরে ডলার কিনতে ব্যাংকগুলোর ব্যয় হয় ১৯ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরে ব্যাংকগুলো ডলার কিনতে ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এ সময় ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার যোগ্য অর্থ কমে গেছে। বর্তমানে অর্থের অভাবে অধিকাংশ ব্যাংকের ঋণ দেয়ার গতি কমে গেছে। সর্বশেষ জুলাই মাসে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ হার ২০১৩ সালের জুনের পর সর্বনিম্ন। ওই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ। আগের মাস জুনে বেসরকারী খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এ ছাড়া চলতি বছরের জুন মাসের তুলনায় জুলাইয়ে বেসরকারী ঋণ না বেড়ে উল্টো কমে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, ডলারের দাম চাহিদা ও জোগানের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তাতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডলারের দাম কিছুটা বাড়তে পারে। এতে প্রবাসীরা সুবিধা পাবেন এবং রফতানিকারকরা লাভবান হবেন। অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় আমদানি কমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কর্মকান্ড বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেমিটেন্স এসেছে ১ হাজার ৬৪২ কোটি ডলার, একক অর্থবছরে যা সর্বোচ্চ পরিমাণ। এর আগে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেমিটেন্স দেড় হাজার কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের দুই মাসে ৩০৮ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে দেশে। এছাড়া গত অর্থবছরে রফতানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলার। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমদানির পেছনে দেশের ব্যয় (সিএ্যান্ডএফ ভিত্তিক) হয়েছে ৫ হাজার ৯৯১ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আমদানি ব্যয়ের তুলনায় ১.৭৮ শতাংশ বেশি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশ থেকে অর্থ পাচারের একটি পথ হচ্ছে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ওভার ইনভয়েস দেখানো। অর্থাৎ যে দামে পণ্য কেনা হচ্ছে, তার চেয়ে বেশি দাম দেখিয়ে বাড়তি অর্থ বিদেশে পাচার হয়। আবার যে পণ্য আমদানি হওয়ার কথা, তার বদলে কম দামী পণ্য আনা অথবা খালি কন্টেনার আনার ঘটনাও ধরা পড়েছে কখনও কখনও। আবার পণ্য রফতানিতে আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমেও অর্থ পাচার হয়। যে পণ্যের দাম ১০০ ডলার, ক্রেতার সঙ্গে বোঝাপড়া করে তা ৭০ ডলার দেখিয়ে রফতানি করেন ব্যবসায়ী। বাকি ৩০ ডলার তিনি বিদেশী সেই ক্রেতার কাছ থেকে নিয়ে তা বিদেশেই রেখে দেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারী গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এটা হয়ে আসছে। কোন কারণে অনিশ্চয়তা বাড়লে অর্থ পাচারের প্রবণতাও বাড়ে। আহসান মনসুর বলেন, বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে মূলত তিন ভাগে। প্রবাসীদের মাধ্যমে যে রেমিটেন্স দেশে আসার কথা সেটা না এসে তৃতীয় একটি পক্ষের মাধ্যমে তা কানাডা-আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। যে রেমিটেন্স ব্যাংকিং চ্যানেলে এসে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হওয়ার কথা, তা দেশে না এসে বাইরেই থেকে যাচ্ছে।