ডেঙ্গুর মাঝেও ঈদ আনন্দের হাতছানি


শতফুল ফুটতে দাও
অথর
সম্পাদকীয় ডেক্স   ঢাকা বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১২ আগস্ট ২০১৯, ১:০৬ অপরাহ্ণ
ডেঙ্গুর মাঝেও ঈদ আনন্দের হাতছানি

ঈদুল আজহা আসন্ন। ত্যাগের মহিমা নিয়ে প্রতি বছরই আসে ঈদুল আজহা। এ উপলক্ষে দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী পশু কোরবানি দেবে মহান আল্লাহর রাহে।
এ কোরবানির মূল তাৎপর্য নিছক পশু কোরবানি দেয়া নয়, মনের ভেতরকার পশুকেই কোরবানি দেয়া ঈদুল আজহার মূল চেতনা। ঈদুল ফিতর থেকে ঈদুল আজহার চরিত্র কিছুটা ভিন্ন।

ঈদুল ফিতর আসে এক মাস সিয়াম সাধনার পর। সিয়াম সাধনা নিছক পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়। মানুষের ভেতরে যেসব পাপ চিন্তা কাজ করে সেগুলোকে জ্বালিয়ে, পুড়িয়ে পরিচ্ছন্ন হওয়াই সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য। এক মাস সিয়াম সাধনার পর যে ঈদ আসে সেই ঈদে মানুষ আনন্দ করে। দেয়া ও নেয়ার চেতনায় মানুষ মানুষের সঙ্গে কোলাকুলি করে,

একে অপরের প্রতি শুভেচ্ছা বিনিময় করে।

ঈদুল ফিতরের প্রত্যুষে স্নান ও অজু করে প্রত্যেক মানুষ পবিত্র হয় এবং ঈদের জামাতে অংশগ্রহণের জন্য যার যার সাধ্যমতো ভালো পরিধেয় পরে ঈদগা অথবা মসজিদের দিকে অগ্রসর হয়।

ঈদের জামাতের শেষে মিষ্টান্নসহ বিভিন্ন মুখরোচক খাবার দিয়ে প্রতিবেশীরা একে অপরের সঙ্গে অমলিন আনন্দে মিলিত হয়। আনন্দের এ সমারোহ শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

অমুসলিম প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ঈদ আনন্দের বিনিময় হয়। সত্যি বলতে কী, ঈদের দিনের সকালবেলার তুলনায় আর কোনো সকালই এমন পবিত্রতা, কালিমাহীনতা এবং নির্দোষ আনন্দ নিয়ে আসে না।

লেখক আবুল ফজল তার এক উপন্যাসে একটি মেয়ের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘মেয়েটি উৎসব দিনের প্রভাতের মতো সুন্দর।’

আবুল ফজল উৎসব দিনের কথা বলেছেন।

নির্দিষ্ট করে ঈদ উৎসবের কথা বলেননি। প্রত্যেক কালচারেই বিচিত্র সব উৎসব থাকে। এগুলোর কোনো কোনোটি ধর্মের সঙ্গে, আবার কোনো কোনোটি কেবলই প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।

প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত উৎসবের সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের বৈশাখী উৎসব, শারদীয় উৎসব, পৌষ মেলা, নবান্ন উৎসব, চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব এবং নববর্ষের উৎসবের কথা বলতে পারি। তবে বাংলাদেশে দুই ঈদ এবং নববর্ষের মতো বড় কোনো উৎসব আর কোনোটি নয়। সময়ের বিবর্তনে কোনো কোনো উৎসব প্রাধান্য অর্জন করে, আবার কোনো কোনো উৎসব গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে।

আধুনিকতার বিস্তারে বাংলাদেশের পুরনো কিছু উৎসব অতীতের মতো অগ্রগণ্য অবস্থায় নেই। এগুলোর রেশ ধরে রাখার জন্য সংস্কৃতিমনা নাগরিকরা শহর ও নগরকেন্দ্রিক কিছু

অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তবে শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর হৃতয় ছুঁয়ে যাওয়া উৎসবগুলোর মধ্যে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা এবং নববর্ষই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশে নগরায়ণ প্রক্রিয়া খুব দ্রুতই এগিয়ে চলছে। বর্তমানে জনগোষ্ঠীর ৩৫ শতাংশ শহরে বাস করে। কিন্তু শহর-নগর এখনও এদের একমাত্র ঠিকানা হয়ে উঠেনি। ঈদের সময় এলে দেখা যায় রাজধানী ঢাকা থেকে নানা বাধাবিঘ্ন ডিঙিয়ে মানুষ ঈদ উদযাপন করতে ছুটে নিজ নিজ গ্রামের পথে। আসলে বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য গ্রামের বাড়িটি এখনও অনেকের আসল ঠিকানা। সেখানে প্রোথিত আছে নিজ নিজ শেকড়। অনেক কারণের মধ্যে যে কারণে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নগর ও শহরবাসী নাগরিক হয়ে ওঠেনি তা হল, জীবনযাত্রার জন্য দ্বৈত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা।



কারণে শহরের অনেক মানুষের মধ্যে গ্রামীণ অভ্যাসগুলো লক্ষ করা যায়। কেউ কেউ হয়তো একে ‘গ্রাম্যতা’ বলে পরিহাস করতে পারে। যাই হোক এটাই বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা। এই সমাজ বাস্তবতায় একজন সমাজতত্ত্ব¡বিদ অনুন্নত দেশের শহর নগরগুলোকে Cities of the Peasants বলে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলা ভাষায় এর অর্থ- কৃষকের নগরী।

বাংলাদেশে নগরায়ণ প্রক্রিয়া দ্রুত অগ্রসর হতে থাকলেও এখনও রাজধানী ঢাকা একটি city of Peasants ছাড়া আর কিছু নয়। এখানে Peasant অর্থে বুঝতে হবে ‘গ্রামের মানুষ’। গ্রামেই যাদের নাড়ি পোঁতা, গ্রামেই যাদের পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, চাচা-চাচি অথবা মামা-মামিসহ আপনজনরা বাস করেন।

তাদের স্নেহের পরশে সিক্ত হওয়ার জন্য ঈদ উৎসবের সময় যেমন ব্যগ্রতা লক্ষ করা যায়, আর কোনো উৎসবের সময় এমনটি লক্ষ করা যায় না। নির্ভরযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও অনেকে মনে করেন, ঈদের সময় ঢাকায় থাকা ৫০ শতাংশ মানুষ গ্রামীণ ঠিকানায় প্রত্যাবর্তন করে। ঢাকা ঈদের ছুটির ক’দিনে হয়ে ওঠে যানজট ও দূষণমুক্ত।

এবারের ঈদুল আজহার আগে মাসাধিককাল ধরে ঢাকায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। এবারের ডেঙ্গুর বৈশিষ্ট্য অতীতের তুলনায় ভয়াবহ। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে দু-চারদিনের মধ্যে মৃত্যু ঘটেছে এমন খবর প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে আসছে। একটি পত্রিকায় ৭ আগস্টের শিরোনাম ছিল, ডেঙ্গু রোগী বাড়ছেই, ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ২ হাজার ৩৪৮, আগস্টের ৬ দিনে ১১,৪৫১। ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের ৬৩ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে যেসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আছে তাদের অবহেলা, শৈথিল্য ও দুর্নীতি নিয়ে অনেক শোরগোল উঠেছে। আমি এগুলোর বিস্তারিত বর্ণনা করতে চাই না। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে এর মধ্যে ৭০ জনেরও বেশিসংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে বেশ ক’মাস আগে গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে সাবধানবাণী উচ্চারিত হওয়া সত্ত্বেও ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সময়মতো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মশা নিধনের জন্য যে ওষুধ আনা হয়েছে তা অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। জাতি হিসেবে এটা আমাদের দুর্ভাগ্যই বলতে হবে।

দুর্ভাগ্য ও দুর্দৈবের মধ্যে দিন কাটাতে কাটাতে আমরা যেন সর্বংসহা হয়ে উঠেছি। কোনো কষ্টে, কোনো অপমানে এবং কোনো নির্যাতনেই আমরা প্রতিবাদমুখর হচ্ছি না, অথবা হতে পারছি না। কারণ গণতান্ত্রিক অধিকারের চৌহদ্দি খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে।

বড় বড় শহরের হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কিটের অভাবও বেশ তীব্র। দেশের অধিকাংশ হাসপাতাল বিশেষ করে মফস্বলের হাসপাতালগুলো ক্রিটিক্যাল ডেঙ্গু রোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারছে না।

সবচেয়ে বড় বিপদের কথা হল, এবারের ডেঙ্গুজ্বর অনেক ক্ষেত্রে একই সঙ্গে মানুষের হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক, যকৃৎ ও বৃক্ক অকার্যকর করে ফেলছে। এসব ক্ষেত্রে রোগীকে বাঁচানো খুবই কঠিন হয়ে পড়ে।

এবারের ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে আমাদের যা শিক্ষণীয় তা হল, সামনের বছরগুলোতে ডেঙ্গুর ভাইরাস আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে। ফিলিপাইন এতদঞ্চলেরই একটি দেশ। সে দেশে ডেঙ্গুর মাত্রা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে যে সে দেশের সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।
আমাদের দেশে কেউ কেউ জরুরি অবস্থা ঘোষণার দাবি তুলেছেন। প্রশ্ন হল, জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে কী লাভ হবে যদি সেই মোতাবেক কর্মপন্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক, স্বাস্থ্যগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব না হয়।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে কমপক্ষে ৫০-৬০ লাখ মানুষ ঢাকা থেকে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে যাবে। এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো এর মধ্যেই ডেঙ্গু ভাইরাসে ইনফেক্টেড হয়ে আছে। এরা যখন গ্রামে যাবে এদের এডিস মশা দংশন করে অন্যদের মধ্যেও ভাইরাসটি ছড়িয়ে দেবে। ফলে সারা দেশে আরও ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। গ্রামের পরিবেশটাই এমন যে এতে খুব সহজেই এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এবার খুব বৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামের ফলদ ও উদ্ভিজ বাগানে পানি জমে থাকে। এছাড়া কর্দমাক্ত জমিতে ও চলার পথে মানুষের পদভারে ও গবাদিপশুর বিচরণের ফলে যেসব ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়, দেখা যায় সে গর্তগুলোতে জমে থাকা পানি থিত হয়ে স্ফটিক স্বচ্ছ হয়ে ওঠে।

এজন্যই বোধহয় কবি লিখেছিলেন, ‘গোষ্পদে বিম্বিত যথা অনন্ত আকাশ’। এগুলো এডিস মশার প্রজননের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ৮৬ হাজার গ্রামে পরিস্থিতি অনেকটা এরকমই। সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ, বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইউনিয়ন পরিষদগুলোকে কাজে লাগিয়ে কার্যকর মশক নিধনকারী ওষুধ ছিটানোর বা স্প্রে করার ব্যবস্থা করতে পারবে কি? ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে এই প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মহল কিছু ভেবে দেখেছেন কি?

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ