দেহ আছে প্রাণ নেই


অথর
অর্থনৈতিক ডেক্স   ব্যবসা বানিজ্য
প্রকাশিত :৩ অক্টোবর ২০১৯, ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ
দেহ আছে প্রাণ নেই

রাজধানীর প্রতিটি থানা ও ট্রাফিক পুলিশের ডাম্পিং জোন দেখলেই মনে হয় যেন পরিত্যাক্ত গাড়ির এক-একটি কবরস্থান। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, অযত্ন-অবহেলায় দীর্ঘদিন মরিচা ধরে যেন কঙ্কাল হয়ে পড়ে আছে হাজারো যানবাহন। দেখে মনে হয় এ যেন গাড়ির কবরস্থান। এ সব গাড়ির নেই কোনো অভিভাবক। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, বৈধ কাগজপত্র না থাকা, ফিটনেস সনদ না থাকা, মামলার আলামতসহ বিভিন্ন কারণে যানবাহনগুলো জব্দ করে এসব ডাম্পিং স্থানে রাখে পুলিশ।

এদিকে, বছরের পর বছর পড়ে থেকে ব্যবহারের অনুপোযোগী হয়ে পড়ছে এসব গাড়ি। আবার চুরি হয়ে যাচ্ছে এসব গাড়ির অনেক যন্ত্রাংশ। অনেকটা দেহ আছে যেন প্রাণ নেই! এভাবেই থানা আর পুলিশের ডাম্পিং জোনে দীর্ঘদিন পড়ে

থেকে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার যানবাহন।

পুলিশ বলছে, মামলা নিস্পত্তি না হওয়ায় আটক বা জব্দ করা যানবাহন মালিকদের বুঝিয়ে দেয়া যায় না। অনেক সময় মালিকদেরও আগ্রহ থাকে না। রাজধানীতে নানা কারণে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে প্রতিদিনই বেশ কিছু যানবাহন বাজেয়াপ্ত করা হয়। এরপর সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ডাম্পিং স্টেশনে।

ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ঢাকায় ট্রাফিক বিভাগের কোন স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন না থাকলেও প্রায় সবসময়ই গড়ে ১ থেকে ২ হাজারের মত গাড়ি থাকে এসব ডাম্পিং স্টেশনে। যেখানে শুধু ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনেই নয় বিভিন্ন মামলার আলামতের গাড়িও পড়ে থাকতে দেখা যায় বছরের পর বছর।

সরেজমিনে দেখা যায়, আগারগাঁওয়ের মূল ডাম্পিং স্টেশনটি একটি সরকারি

জায়গার ওপরে। এখানকার কিছু গাড়ি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের কারণে সাময়িক সময়ের জন্য রাখা হলেও অনেক গাড়ি পড়ে রয়েছে বছরের পর বছর। এসব পড়ে থাকা গাড়ির গাঁ বেয়ে গজিয়েছে লতাপাতা। ঘন বন জঙ্গলের কারণে কিছুটা গিয়ে আর যাওয়া সম্ভব হয় না। রিকশা থেকে শুরু করে বড় ট্রাক-বাস কি নেই এখানে। সব ধরনের যানবাহন রয়েছে ডাম্পিং স্টেশনে। ট্রাফিক আইনে আটক অধিকাংশ গাড়ির মালিক বা চালক এসে নিয়ে গেলেও থেকে যায় বিভিন্ন থানা থেকে আসা মামলার আলামতের জন্য রাখা গাড়িগুলো।

আগারগাঁওয়ের মূল ডাম্পিং জোনে দেখা যায় কোনো কোনো গাড়ি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পড়ে রয়েছে। ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে থাকা গাড়ি দেখে মনে হয়

যেন গাড়ি তো নয় এ যেন এক একটি কঙ্কাল।

পুলিশ বলছে, দিনে গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি গাড়ি আসে ডাম্পিং স্টেশনে। তাই নিজস্ব কোন ডাম্পিং জোন না থাকায় বাধ্য হয়ে অনেক সময় থানার সামনে রাখা হয় মামলার আলামত হিসেবে।

পুলিশের একটি সূত্র বলছে, মামলার আলামতের পাশাপাশি বেওয়ারিশ গাড়িরও জায়গা হয় এখানে। দুর্ঘটনা কবলিত বিভিন্ন গাড়িও রয়েছে এসব স্টেশনে। দীর্ঘসময় পড়ে থাকায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে গাড়ি, অন্যদিকে রাস্তার ওপরে গাড়ি রাখায় ব্যহত হচ্ছে যান চলাচল।

ট্রাফিক বিভাগ বলছে, স্থায়ী কোনো ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় তারা নিরুপায় হয়েই এসব স্থানে গাড়ি রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। রাজধানীর বেশির ভাগ থানায় নেই কোনো গাড়ি রাখার স্থান। তাই বাধ্য

হয়েই থানার পাশের রাস্থাগুলোতে এগুলো রাখা হয়। তবে এসব গাড়ির বেশির ভাগই যন্ত্রাংশ নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থানার এক পুলিশ অফিসার বলেন, বেশির ভাগ গাড়িতে নেই পার্স। যেকোনো পুলিশের মোটরসাইকেলের জন্য পার্স লাগলে সুবিধামত ওইসব গাড়ি থেকে খুলে নেয়া হয়। আর বাকিগুলো ময়লা পড়ে জং ধরে নষ্ট হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণেই আটক করা যানবাহন নিতে পারেন না মালিকরা। এতে তারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তেমনি ক্ষতি হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার। এ অবস্থায় গাড়ি জব্দ করার চেয়ে জরিমানা করার ওপর জোর দেয়ার পক্ষে মত দেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, এভাবে গাড়িগুলো নষ্ট না করে যদি একটি অর্থদণ্ড করা হতো তাহলে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেত গাড়ির মালিকরা, সরকারও পেতো রাজস্ব। এতে যেমন ক্ষতি হচ্ছে দেশের, তেমনই ক্ষতি হচ্ছে মালিকদের।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল আলম এ বিষয়ে বলেন, বিভিন্ন মামলার জট থাকে সেগুলো আদালতের রায়ের উপর নির্ভর করে। আদালত রায় না দেয়া পর্যন্ত আটক গাড়ি ফেরত দেয়ার সুযোগ নেই।