ধীন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে কাশ্মীর


অথর
শিক্ষক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :৯ আগস্ট ২০১৯, ৭:২৮ অপরাহ্ণ
ধীন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হবে কাশ্মীর

পৃথিবীর ভূ-স্বর্গ খ্যাত নান্দনিক সৌন্দর্যের কাশ্¥ীর যেন আজ দৃশ্যমান নরক।কট্টর হিন্দুত্ববাদ মৌলবাদী বিজেপি সরকারের আগ্রাসী মনোভাবের খেসারত দিচ্ছে শান্তিপ্রিয় স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরি মুসলমান।গত ৬ আগষ্ট মোদি সরকার তার নির্বাচনী ইসতেহার অনুযায়ী সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসনের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়।অপরদিকে সংবিধানের ৩৫(ক)ধারা বাতিল করে মুসলমানদের বিতারিত করে সেখানে হিন্দুদের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ করার পথ সুগম করে দিলো।এখন থেকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ায় ভারতীয়রা সেখানে জমি কিনে বসত গড়ে তুলতে পারবে ও ব্যবসা বাণিজ্য সহ সকল সুবিধা ভোগ করতে পারবে।ক্রমান্বয়ে মুসলমানদের কোণঠাশা করে মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য করা হবে।আর এভাবেই একদিন সংখ্যালঘিষ্টতা ঘুচিয়ে কাশ্মীর হবে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। মূলত ব্রিটিশ শাসনামলে

কাশ্মীর ছিল একটি স্বাধীন রাজ্য।ব্রিটিশ সরকারকে নামমাত্র কর দিয়ে রাজ্যটি পরিচালিত হতো বলে এর নাম ছিল প্রিন্সলি স্টেইস্ট।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মুসলিম অধ্যুুষিত স্বাধীন কাশ্মীরের শেষ হিন্দু রাজা ছিলেন হরি সিং।১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের ভাগের পর অপরূপ কাশ্মীর করায়ত্ত করতে তৎপর হয়ে উঠে ভারত ও পাকিস্তান।ইত্যসময়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি ও ক্ষীণ সামরিক শক্তির কারনে সেখানে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে বিদ্রোহ।এই সুযোগে বহিরাগত মিলিশিয়া বাহিনী ঢুকে পড়ে বিদ্রোহের আগুনে ঘি ঢেলে দাবানল ছড়িয়ে দেয় পুরো কাশ্মীর জুড়ে।বিদ্রোহ দমাতে ও মুসলমানদের জানমালের হেফাজতের মানসে পাকিস্তান সরকার কাশ্মীরে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেয়।এতে ভীত হয়ে পড়েন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান দেশের রাজা হরি সিং এবং তিনি তৎকালীন ভারতের গভর্নর

জেনারেল লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন ও প্রধানমন্ত্রি জওহরনাল নেহেরুর কাছে সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেন।কিন্তু কাশ্মীরকে অখন্ড ভারতের অংশ করার খায়েশ চরিতার্থে তারা উভয়েই রাজাকে জানিয়ে দেন যে,ভারতের সাথে যোগদানের চুক্তিতে সই না করলে তারা কোন প্রকার সহযোগীতা করবে না।তখন হিন্দু রাজা কাশ্মীরি মুসলমানদের বলির পাঠা করতে ২৬ অক্টোবর ১৯৪৮ সালে শর্ত সাপেক্ষে সাময়িকভাবে ভারতের সাথে যোগদানের চুক্তিতে সই করেন।শর্ত ছিল এই যে,রাজার মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে স্বায়ত্তশাসন,অন্য রাজ্যের কেউ কাশ্মীরে জমি ক্রয় করতে পারবে না ও পরবর্তীতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মতামত নিয়েই স্থায়ী যোগদান।তখন বাঁধা হয়ে দাড়ালেন নেহেরুর ঘনিষ্ট বন্ধু কাশ্মীরের তৎকালীন প্রভাবশালী জনপ্রিয় নেতা শেখ আব্দুল্লাহ।নেহেরু তাকে বোঝালেন,ভারতের অন্যান্য রাজ্যে মূখ্যমন্ত্রি হলেও

স্বায়ত্তশাসিত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রি করা হবে আব্দুল্লাহকে।শেখ আব্দুল্লাহ ভেবে দেখলেন,পাকিস্তানের সাথে থাকলে বড়জোর প্রাদেশিক গভর্নর হবেন।আর ভারতের সাথে থাকলে প্রধানমন্ত্রিত্ব,এই প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভ সামলাতে না পেরেই তিনি ভারতের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান।তার সেই লোভের আগুনে আজো পুড়ছে কাশ্মীর।বাহাত্তর বছরে ভারতের সেনাবাহিনী ও জঙ্গি তৎপরতায় সেখানে প্রাণ দিয়েছে প্রায় ৭০ হাজার কাশ্মীরি মুসলিম,ধর্ষিত হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মুসলিম নারী ।চুক্তি পরবর্তী ভারত এর সামরিক হস্তক্ষেপে কাশ্মীর ইস্যুতে বেঁধে গেল পাক-ভারত যুদ্ধ।অসম যুদ্ধে বিষম খেয়ে জাতিসংঘের শরণাপন্ন হয় পাকিস্তান ও ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে।জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয় উভয় দেশ এবং বলা হয় পরবর্তীতে গণভোটের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হবে।সে মোতাবেক নিষ্পত্তি

না হওয়া অব্দি যে যেই অবস্থানে আছে তা বজায় রেখে টানা হয় লাইন অব কন্ট্রোল।বিশ^ থেকে বিচ্ছিন্ন কাশ্মীর যেন এক বিভীষিকাময় মৃত্যু উপত্যকায় পরিনত হয়েছে।ভারতীয় লাখো সেনাসদস্যের বুটের আওয়াজে আর ভারী সামরিক সাজোয়া যানের বিকট শব্দে প্রকম্পিত আজ পুরো কাশ্মীর।কারফিউ জারি করে সেখানে মৌলিক সুবিধা বি ত করে রাখা হয়েছে জনগনকে।দোকানপাট,বাজার বন্ধ থাকায় চরম খাদ্য সংকট ও চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় অমানবিকভাবে দিনানিপাত করছে শিশু নারী পুরূষসহ বয়োবৃদ্ধরা।এখন প্রশ্ন হলো,শেষ পর্যন্ত অবরুদ্ধ কাশ্মীরকে মুক্ত করতে পারবে কী দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া কাশ্মীরি জনগন?নির্যাতন নিপীড়ন সহ্য করতে করতে,স্বজন হারানোর ব্যথা সইতে সইতে,গুলির আওয়াজ শুনতে শুনতে আর রক্তাত্ত প্রান্তর ও মৃত্যু দেখতে দেখতে কাশ্মীরি জনগন যেন আজ এক মৃত্যুঞ্জয়ী জাতি।ইতোমধ্যেই তারা মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে বিক্ষোভ করেছে এবং কয়েকজন প্রাণও দিয়েছে।ক্ষোভে ফুঁসছে কাশ্মীরসহ বিশ^ মুসলিম উম্মাহ।শহীদি মৃত্যুকে আলিঙ্গন আর অসম সাহসী কাশ্মীরি জনতাকে বন্দুকের নলে বেশীদিন আটকানো যাবে বলে মনে হয়না।অপরদিকে পাকিস্তান ইতিমধ্যে কাশ্মীরি মুসলমানদের রক্ষায় ভারতের বিরুদ্ধে যুুদ্ধে নামার ঘোষনা দিয়ে সীমান্ত অভিমুখে সাজোয়া যানসহ সেনা পাঠাতে শুরু করেছে।ভারতের চির শত্রæ চীনও এমন আগ্রাসী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে কাশ্মীরিদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে।তাছাড়া ভারতের জনসাধারণের বড় একটা অংশও মোদি সরকারের সমালোচনায় সরব হচ্ছে।আবার ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টও সরকারের একতরফা সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রায় দেওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান যে,মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরকে গিলে খেয়ে হিন্দু অধ্যুষিত করার মোদির খায়েস পূরণ হবে বলে মনে হচ্ছে না।কেননা একদিকে কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ আন্দোলন,অপরদিকে পরমাণু শক্তিধর চীন-পাকিস্তান ও বিশ^ নেতাদের চাপ সামাল দেওয়া মোদির জন্য সহজ কাজ হবেনা।এদিকে ভারতের অভ্যন্তরের স্বাধীনতা কামী প্রদেশ গুলোতেও অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।সত্যিকার অর্থেই এবার কাশ্মীর এর স্বাধীন হবার পথ উম্মুক্ত হলো বলে মনে করি।আর এই সুযোগটা সৃষ্টি হয়েছে,উগ্র হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকারের চাপিয়ে দেওয়া অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়া।আমরা জানি,স্বায়ত্তশাসনের হাত ধরেই আসে স্বাধীকার আন্দোলন আর স্বাধীকার আন্দোলনেই আসে স্বাধীনতা।হয়তো এর জন্য অনেক প্রাণ বলিদান হবে,লাশের পাহাড়ে পাহাড়ে নির্মিত হবে রক্তাত্ত পিরামিড।সেই পিরামিডের উপরেই একদিন উড়বে স্বাধীন কাশ্মীরের পতাকা আর স্বাধীন সূর্যের আলোয় ¯œাত হবে ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর।

আব্দর রহমান লাবু
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ঠাকুরগাঁও।