প্রবন্ধের শিরোনাম সমকালীন বাংলা সাহিত্য-চর্চার সমস্যা ও সম্ভাবনা


ড. মোঃ আব্দুর রশীদ
অথর
এনামুল ইসলাম মাসুদ   শিক্ষা বাতায়ন ডেক্স
প্রকাশিত :৫ জুলাই ২০১৯, ১:০৫ অপরাহ্ণ
প্রবন্ধের শিরোনাম  সমকালীন বাংলা সাহিত্য-চর্চার সমস্যা ও সম্ভাবনা

সমকালীন বাংলা সাহিত্য-চর্চার সমস্যা ও সম্ভাবনা সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথাÑ পরের কথাÑ বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেনÑ তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া Ñ সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে

সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে Ñ সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাইÑ যা একাধারে সমসাময়িকÑশাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় নাÑ সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।

আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব,

কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তিÑ আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকেÑ সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেমÑবৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয়

যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছেÑ সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণÑ যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাসÑ ইতিহাসের চোরা¯্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।

সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তাÑ এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে

যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণÑ এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেনÑ উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীনÑসর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধানÑ এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।

দুই
একজন সাহিত্য ¯্রষ্টার কল্পনালোকে ‘সংসার ধুলি-জালে’র মাঝখান হতে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ ধরা পড়ে সমভাবেÑ তাঁর দৃষ্টি-সৃষ্টি অনেকদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এক্ষেত্রে সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে সমাজবদলের হাতিয়ারÑ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারালো অস্ত্রÑ অধিকার আদায়, নৈতিক মূল্যবোধ প্রকাশক এবং ব্যক্তিক অনুভূতি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু সাহিত্য তাঁর স্বধর্মচ্যুত হলে সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যও চরমভাবে পথভ্রষ্ট হয়। “সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেয়া, কারো মনোরঞ্জন করা নয়। এ দুয়ের ভেতর যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ, সেটি ভুলে গেলেই লেখকেরা নিজে খেলা না করে পরের জন্যে খেলনা তৈরী করতে বসেন। সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে, তার প্রমাণ বাংলাদেশে আজ দুর্লভ নয়।” [প্রমথ চৌধুরী, সাহিত্যে খেলা]

আসলেই যে-কথাই বলিনা কেন সাহিত্যিকও মানুষÑ সমাজের বাসিন্দাÑ সমাজের নানান কর্মে তিনিও নিবিড়ভাবে জড়িত। সাহিত্যসৃষ্টি তো ঘরের কোনো এক খিল দেওয়া কামরায় সৃষ্টি হয়নাÑ তাই সমাজের বৃহত্তর জীবন-জীবনের উর্বর-অনুর্বর ভূমি, ঘটনাপ্রবাহ সাহিত্যিকের পক্ষেও এড়িয়ে চলা অসম্ভব। কিন্তু সমস্যা হয় তখনইÑ যখনই সে নিজেকে কোনো একটি বৃত্তবন্দি কামরায়Ñ ‘লাল-নীল-সাদা-কালো-গোলাপি’ মতাদর্শে নিজেকে বন্দি করেন। “সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন। আজ সে-ভাবনা রীতিমত দুর্ভাবনার পর্যায়ে পৌঁছেছে, কারণ এক প্রবল রাজনৈতিক ধারা সাহিত্যকে আপন ঘূর্ণাবতের মধ্যে টেনে আত্মসাৎ করতে উদ্যত, যেমন করে মধ্যযুগে ধর্ম আত্মসাৎ করেছিল শিল্প-সাহিত্য-দর্শন-বিজ্ঞানের স্বতন্ত্র বিকাশকে।” [আবু সয়ীদ আইয়ুব, ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক] এ-কথা সত্য যে দলীয় রাজনীতির প্রবেশ সাহিত্যের নির্মল সত্তাকে আবিল করে। সাহিত্যিক যতক্ষণ সাহিত্যকর্মরত ততক্ষণ তিনি একমাত্র নিজের প্রতিভারই অনুগামী, অন্য কোনো অধিনায়কের প্রত্যাদেশ মেনে চললে তিনি স্বধর্মচ্যুত হবেনÑ লক্ষ্যভ্রষ্ট হবেন। সাহিত্যিক সমাজের একজন বলে সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণ করা তাঁর কর্তব্য এবং সাহিত্যিক বলেই সৌন্দর্যের আরাধনা করা তাঁর ধর্ম; এ দুটির সমন্বয় সাধিত হলে প্রকৃত সাহিত্যসৃষ্টির হয়Ñ এর বিপরীত হলে এপাশ ওপাশ করতে গিয়ে লেখক ‘ধপাশ’ করে পড়েন। বাংলা সাহিত্যের বর্তমান লেখকেরা নিশ্চিতভাবে মেধাবীÑ কিন্তু তাঁদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রে ‘টকশো’, সংবাদপত্রে সাহিত্যচর্চার পরিবর্তে বিশেষ বিশেষ নিবন্ধ রচনা, ‘ফেসবুক’ নির্ভর তথাকথিত সাহিত্যপ্রীতি, টেলিভিশনের জন্য সিরিয়াল ভিত্তিক স্ক্রিপ্ট নির্মাণ, সস্তা বিনোদনের জন্য গোয়েন্দা-কাহিনি ও ভূতের গল্প রচনা, স্মার্টফোনের বহুমাত্রিক ব্যবহার নিরপেক্ষ এবং উৎকৃষ্টমানের সাহিত্যরচনার পথে অন্তরায় বলে মনে করা হয়। এসব জায়গায় একশ্রেণির সৃজনশীল এবং মননশীল লেখক যেমন ঝুঁকে পড়ছেনÑ তেমনি বিশেষ শ্রেণির পাঠকও সেদিকে ধাবিত হচ্ছে। আর এ কারণেই সাহিত্যশিল্প ভালোমানের লেখক এবং পাঠক হারিয়ে তার স্বধর্ম থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। লেখক ও পাঠকগণ এ-বিষয়টি যদি এখনই অনুধাবন করতে ব্যর্থ হনÑ তবে সাহিত্যের জন্য তা হবে বিপদ; আর যদি বুঝতে সমর্থ হন তাহলে সেটা সাহিত্যের জন্য নিরাপদ এবং আশীর্বাদ।

সাহিত্য-শিল্পের প্রধান কাজ হলো মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করাÑ মনকে শুধু মুগ্ধ করা নয়, হৃদয়কেও জাগিয়ে তোলা। কিন্তু বর্তমানে মনকে মুগ্ধ করার মতোÑ হৃদয়কে নাড়া দেওয়ার মতো কোনো সাহিত্যকর্ম রচিত হতে দেখা যাচ্ছে নাÑ আর এ কারণেই সুহৃদ-পাঠকও সাড়া দিচ্ছেন না। বর্তমান বাংলা সাহিত্যসহ বিশ্বসাহিত্যচর্চার বড় সমস্যাÑ হৃদয়-ছুঁয়ে যাওয়ার মতো সাহিত্যকর্মের স্বল্পতা। বাংলা সাহিত্যে এ-সমস্যা আরো বেশি তীব্র। আজ রাজসভায় যেমন নবরত্মের স্থান নেইÑ তেমনি সাহিত্যিকেরা নবরত্ম হয়ে রাজসভায় আসন নিতে ব্যর্থ হচ্ছেনÑ আর বিশ্বসভায় এঁদের কদর আজ তলানিতে ঠেকেছে। অবশ্য এ-সমস্যার পিছনে নানাবিধ কারণ বিদ্যমান। রেনেসাঁ-যুগের বাংলা উপন্যাসের প্রথম সার্থক¯্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [১৮৩৮-১৮৯৪] তাঁর অভিজ্ঞতার ভা-ার থেকে “বাঙ্গালা নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন” প্রবন্ধে লেখকদের জন্য ১২টি উপদেশ দিয়েছেন; সেখানে তিনি দ্বিতীয় নম্বর উপদেশে বলেছেন : “টাকার জন্য লিখিবেন না। যদিও এক সময় ইউরোপের লোকেরা টাকার জন্য লিখিতো। কিন্তু আমাদের দেশে সে অবস্থা এখনও আসে নাই।” আসলে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘সে অবস্থা’ কি কখনো আমাদের দেশে আসবে? কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির বর্তমান যুগে সাহিত্যচর্চাও তার রঙ-রূপ বদলিয়েছে। আমাদের বক্তব্য টাকার জন্য না লিখলেও লেখার জন্য তো টাকা প্রয়োজনÑ যে কোনো একটি লেখা; সেটা হাতে লেখায় হোক কিংবা টাইপ করেই হোক কিংবা ইমেইল বা ইমো বা ফেসবুকের মাধ্যমেই হোকÑ বর্তমান সাহিত্যচর্চায় তথ্যযুক্তির প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কোনো সম্মানি নয়Ñ শুধু এসব প্রযুক্তির ব্যবহার করতে হলে সর্বনি¤œ যে খরচ পড়ে তা কি লেখক তাঁর লেখা থেকে পেয়ে থাকেন? তাহলে লেখক সাবলিলভাবে কীভাবেÑ কতদিন তাঁর সাহিত্যচর্চা সচল রাখবেন? লেখার প্রশংসা শুনে লেখকের মনটা স্বাভাবিকভাবে-সামাজিকভাবে উৎফুল্ল হতে পারেÑ কিন্তু তাতে মনের ক্ষুধার মিটলেও পেটের ক্ষুধা মিটবে কি? তাছাড়া বর্তমানের প্রকাশকেরা সেই লেখকের পিছনেই বেশি ব্যস্ত থাকেনÑ যাঁর লেখা বিক্রি করে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হবেন; এক্ষেত্রে ভালো লেখা মুখ্য নয়। স্মরণীয় যেÑ বাংলাদেশের সাহিত্যিকেরা আজ শুধু পাঠকের মুখাপেক্ষী নয়, প্রকাশক আর গ্রন্থবিক্রেতাদেরও মুখাপেক্ষী। লেখক-পাঠক আর প্রকাশকÑ এই তিনের যোগসূত্রেই সাহিত্যের গতি আর সমৃদ্ধিÑ এই তিনের সমন্বয় না হলে সাহিত্যের গতি বিঘিœত হয়। সুতরাং বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে হলেÑ সাহিত্যচর্চার পথকে সুগম করতে হলে এই-তিনের সমন্বয় জরুরি। আসলে সাহিত্যের মূল্য শুধু মানসিক নয়Ñ তার একটা অর্থনৈতিক দিকও আছে। এ দিকের নিরাপত্তা ছাড়া ধারাবাহিক সাহিত্যসৃষ্টি সম্ভব নয়।

বর্তমান সাহিত্যচর্চার আরেকটি সমস্যাÑ আজকের দিনে যাঁরা একটু সুশিক্ষিত-সাহিত্যবোদ্ধা-সাহিত্যসমালোচক-কালচারের বড়াই করেন Ñ তাঁরা অন্যের সাহিত্যকর্মকে অনেকটা উন্নাসিক দৃষ্টিতে দেখেন; তাঁরা সাহিত্যালোচনায় অবতীর্ণ না হয়ে সাহিত্যসমালোচনায় অবতীর্ণ হন, নব্যআলোচকগণ নব্যলেখকদের রচনা থেকে রস নির্ণয়ের চেয়েÑ কষ ঝরাতেই বেশি পছন্দ করেন। এই আলোচকগণ নতুন লেখকদের সাহিত্য-রচনার দুয়ারকে সুগম না করেÑ সেখানে অর্গল দিতেই বেশি তৎপর। নতুন লেখকেরা হঠাৎ করেই সাহিত্যের রাজপথ দিয়ে চলতে না পারলেও ফুটপাত দিয়ে চলার অধিকার তো রাখেন Ñ আলোচকগণেরই দায়িত্ব সাহিত্যের রাজপথে নব্যলেখকদের সাহিত্যের আড্ডায়-আসরে, আলোচনা-সমালোচনা-সহমমির্তায় নব নব রচনায় উদ্বুদ্ধ করে তোলা¬Ñ তাহলেই বাংলা সাহিত্য ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হবে।

তিন
১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি বাংলা সাহিত্য-চর্চা-গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত না হয়ে তা পরিণত হয়েছে প্রকাশনা সংস্থায়। হয়তো জোর করে কাউকে সাহিত্যচর্চার পথে নিয়ে আনা সম্ভব নয়Ñ কিন্তু সাহিত্যানুশীলনের পথে নিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগও তো গ্রহণ করা যেতে পারে। এ-বিষয়ে বাংলা একাডেমির ভূমিকা তর্কের ঊর্ধ্বে নয়। এখানে আরেকটি বিষয় যোগ করা যায়Ñ একসময় বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র বলতে কলকাতাকে ধরা হতোÑ কিন্তু বর্তমানে সেই পরিস্থিতি আর নেই; বর্তমানে ঢাকাকেও বাংলাসাহিত্যের কেন্দ্র বলা হয়। তবে রাজধানী-কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চা-সাহিত্যপ্রকাশনার যে প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে তা থেকে অবশ্যই আমাদের বের হয়ে আসতে হবে।

আমরা বলে থাকি সাহিত্যের কোনো সীমা নেইÑ বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে সাহিত্য রচনা করে ছড়িয়ে দেওয়া যায় সারাবিশ্বে। বাংলা সাহিত্যকেও বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিতে হলে প্রয়োজন বিদেশি ভাষায় ভালো মানের অনুবাদের। আবার বিশ্বসাহিত্যকেও ভালোভাবে জানতে হলেও বিদেশি এবং অন্যান্য ভাষার সাতিহ্যকেও বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে হবে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে এক্ষেত্রে আমাদের দুর্বলতা-সীমাবদ্ধতা অনেক বেশি। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যাঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের মিলন ঘটনোর জন্য ভালো অনুবাদের কোনো বিকল্প নেইÑ সেটা হতে পারে অন্য ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় কিংবা বাংলা ভাষা থেকে অন্য ভাষায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ড.ই. ণবধঃং এর সহযোগিতায় “গীতাঞ্জলি” কাব্যকে ঝড়হমং ঙভভবৎরহমং ইংরেজি রূপ দেওয়ার কারণে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [১৮৭৬-১৯৪৮], বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় [১৮৯৪-১৯৫০], তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় [১৮৯৮-১৯৭১], কাজী নজরুল ইসলাম [১৮৯৯-১৯৭৬], সত্যেন সেন [১৯০৭-১৯৮১], মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় [১৯০৮-১৯৫৬], সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ [১৯২২-১৯৭১], মহাশ্বেতা দেবী [১৯২৬-২০১৬], আখতারুজ্জামান ইলিয়াস [১৯৪৩-১৯৯৭], একালের সৈয়দ শামসুল হক [১৯৩৫-২০১৬], হাসান আজিজুল হক [জ. ১৯৩৬], সেলিনা হোসেনসহ [জ. ১৯৪৭] অন্যান্য লেখকদের সাহিত্যকর্মও যদিও যথাযথভাবে ইংরেজি বা অন্যান্য বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করে নোবেল পুরস্কারের জন্য জমা দেওয়া হতো তাহলে তাঁরাও বিশ্বদরবার থেকে যথোপযুক্ত সম্মান এবং নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতেন। যদিও নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি সাহিত্যবিচারের মানদ- নয়Ñ কিন্তু কোনো একটি ভাষা বা জাতির সাহিত্যচর্চা এবং প্রসার-প্রচার এবং আন্তর্জাতিকতায় উত্তীর্ণ হতে হলে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির প্রয়োজন আছে। “আন্তর্জাতিক মানের হতে হলে দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি সাহিত্যের সাম্প্রতিক প্রবণতা ও বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া প্রয়োজন। অধিকাংশ বাঙালি লেখক বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে এই যোগাযোগ রাখেন বলে মনে হয় না। এর ফলে বাংলা সাহিত্য একটি চক্রে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তাই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ‘আন্তর্জাতিক’ বলে দাবি করতে হলে কেবল ভৌগোলিক কারণ দেখিয়ে নয়, উন্নত মনের উৎকর্ষও অর্জন করা প্রয়োজন।” [হাসনাত আবদুল হাই, দৈনিক প্রথম আলো, ১৯.০১.২০১৮]

তাছাড়া বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার জন্য আগের মতো কোনো সাহিত্যগোষ্ঠী বা সাহিত্য শিবির গড়ে উঠছে না। পূর্বে ‘সংবাদ প্রভাকর’ [১৮৩১], ‘তত্ত্ববোধিনী’ [১৮৪৩], ‘বঙ্গদর্শন’ [১৮৭২], ‘ভারতী’ [১৮৭৭], ‘সুধাকর’ [১৮৮৯], ‘কোহিনুর’ [১৮৯৮], ‘সবুজ পত্র’ [১৯১৪], ‘প্রবাসী’ [১৯১৩], ‘ভারতবর্ষ’ [১৯১৩], ‘সওগাত’ [১৯১৮], ‘মোসলেম ভারত’ [১৯২০], ‘ধূমকেতু’ [১৯২২] ‘কল্লোল’ [১৯২৩], ‘তরুণপত্র’ [১৯২৫], ‘শিখা’ [১৯২৭] ‘কালিকলম’ [১৯২৭], ‘জয়তী’ [১৯৩০], ‘বুলবুল’ [১৯৩৩], ‘চতুরঙ্গ’ [১৯৩৮], ‘সমকাল’ [১৯৫৭] এসব সাহিত্যপত্রিকা কেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার যে জোয়ার এসেছিলÑ তা বর্তমানে অনেকটায় ভাটার টানে চলে গেছে। বর্তমানে যতগুলো সাহিত্যপত্রিকা চলমান তাঁর অধিকাংশই খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছেÑ এসব পত্রিকায় নেই কোনো নতুন নতুন সাহিত্যিক-সৃষ্টির তৎপরতাÑ নেই তেমন কোনো পৃষ্ঠপোষকতা। এসব পত্রিকায় সাহিত্যচর্চা করে চলেছেন কিছু সংখ্যক চিরচেনা মুখ।

সমকালীন পরিবেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লেখক, প্রকাশক, সাংবাদিক তথা মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারীদের উপর ক্রমাগত হামলা, হুমকির ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন রেন্ডম হাউজের সাবেক চেয়ারম্যান জন ম্যাকিনসন ঢাকায় বাংলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকা লিট ফেস্ট’ এর তৃতীয় দিনের আসরে বলেনÑ “লেখকÑসাংবাদিকদের স্বাধীনতার কথা শুধু সংবিধানে আছে, বাস্তবে নেই।… বৈশ্বিক সন্ত্রাসের যে চিত্র তা থেকে উপমহাদেশের সন্ত্রাসবাদের চিত্রটা আলাদা। এখানে মুক্তচিন্তার মানুষের উপর আঘাতটা বেশি আসে।… রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা দিক থেকে তাদের উপর চাপ আসে।” [বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ১৮.১১. ২০১৭] আসলে সরকারি বিধিনিষেধের বেঁড়াজালÑআতঙ্কিত পরিবেশ অতিক্রম করে কতজন বর্তমানে লিখছেনÑ কতজন সত্যভাষণের চেষ্টা করছেন? এর নেতিবাচক উত্তরই প্রাধান্য পাবেÑ অধিকাংশরা নন। তবে সাহিত্যের দীনতা কাটিয়ে উঠতে হলে অবশ্যই আমাদের সাহসী-সৃজনশীল এবং মননশীল লেখকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

বর্তমান বাংলা সাহিত্যে বহুমুখীনতার অভাবÑ সে অভাব দূরীকরণে সাহিত্য¯্রষ্টাদের সচেতন এবং আরো দূরদর্শী হওয়া জরুরি। তবে শুধু লেখক সচেতন হলেই হবেনাÑ পাঠক-প্রকাশক-গ্রন্থ বিক্রেতা-পৃষ্ঠপোশকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন না হলে স্বদেশি সাহিত্যের দীনতা মোচন করা সম্ভব নয়। এছাড়া বাংলাদেশে এখনও সাহিত্যচর্চাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়নিÑ এ বিষয়েও সকলের দৃষ্টিপাত করা জরুরি। যে-সব লেখক লেখাকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন তাঁদেরকেও আমরা দেখেছি সারাজীবন দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ এবং প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে; এক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলাম [১৮৯৯-১৯৭৬], মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের [১৯০৮-১৯৫৬] নাম স্মরণ করা যায়।

চার
আমাদের বর্তমান বাংলা সাহিত্যে বৈচিত্র্য, বিস্তৃতি ও গভীরতার অভাব সুস্পষ্ট; এর সাথে যুক্ত হয়েছে লেখক-প্রকাশক-পাঠক-পুস্তকবিক্রেতাদের সমন্বয়হীনতাÑ জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা। প্রকৃতঅর্থে সাহিত্যচর্চা শুধু কলম পেষা নয়Ñ সাহিত্যচর্চা ফরমাশ খাটা নয়Ñ সাহিত্যচর্চা হচ্ছে ইতিহাসের চোরা¯্রােত-সমাজ-সময়-ব্যক্তির ভাবের আত্মপ্রকাশ। যেখানে আত্মপ্রকাশ নেইÑ সেখানে ছাপার অক্ষরে প্রকাশও মূল্যহীন। স্বাধীনতা চাই লেখার মাধ্যমে আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা; স্বাধীনতা চাই সত্যভাষণের স্বাধীনতাÑ সেটাই লেখকের ধর্ম। সাহিত্যপ্রেমিকদের প্রতি এতটুকু নিবেদনÑ মনের শক্তি দিয়ে লিখুনÑ শক্তিতে যুক্তি দেনÑ যুক্তিতে ভক্তি দেনÑ ভক্তিতে অনুভূতির মুক্তি দেন। বাংলা সাহিত্যচর্চার বর্তমান যে সমস্যা-সীমাবদ্ধতাÑ তা দ্রুত কাটিয়ে উঠে বাঙালি উন্নত ও অগ্রসর জাতির স্বকীয়তায় এগিয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। আর এ প্রত্যাশায় আমরা বাংলা সাহিত্যচর্চায় আরও অধিকতর মননশীল-সৃজনশীল-সংবেদনশীল সাহিত্যসৃষ্টির-সম্ভাবনার অনির্বাণ শিখা জ্বালিয়ে রেখেছি।

তথ্যসহায়ক গ্রন্থ তালিকা [বর্ণানুক্রমিক]
১.আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯৯১)। ব্যক্তিগত ও নৈর্ব্যক্তিক। দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।
২.কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, সাহিত্যের রূপ-রীতি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, রতœাবলী, কলকাতা, ১৯৯৫।
৩.প্রমথ চৌধুরী, প্রবন্ধসংগ্রহ, সুচয়নী, ঢাকা, ২০০১।
৪.শ্রীশচন্দ্র দাস, সাহিত্য সন্দর্শন, চক্রবর্তী-চ্যাটার্জী এন্ড কোং, কলকাতা, ১৯৭৬।

লেখক:
ড. মোঃ আব্দুর রশীদ
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ, চুয়াডাঙ্গা
মুঠোফোন : ০১৯৬৬-৬৩১০৪২