ভারত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় কাশ্মীরে ছিলাম, যা দেখেছি …


অথর
বিদেশের খবর ডেক্স   সারাবিশ্ব
প্রকাশিত :১০ আগস্ট ২০১৯, ৮:৪১ পূর্বাহ্ণ
ভারত নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় কাশ্মীরে ছিলাম, যা দেখেছি …

গত সোমবার কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিল করে বিশেষ সুবিধা কেড়ে নেয় ভারত সরকার। সেই সঙ্গে ঘোষণা আসে, কেন্দ্র থেকে কাশ্মীর পরিচালনা করা হবে। ৩৭০ ধারা বাতিলকে কেন্দ্র করে সেখান থেকে পর্যটকদের সরিয়ে দেওয়া হয় এবং সেখানকার রাজনীতিবিদদের আটক ও সবখানে কারফিউ জারি করে রাখা হয়।

কয়েকদিন ধরেই কাশ্মীরে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধসহ মোবাইলের নেটওয়ার্কও বন্ধ করে রেখেছে ভারত সরকার। গত সোমবার সেখান থেকে বিমানের একটি ফ্লাইট ধরে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন সানা ওয়ানি। সেখানে তিনি যা দেখে এসেছেন, সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন।

সানা বলেন, গত সোমবার বিকেলে আমি কাশ্মীর ছেড়ে নিজের বাসায় আসি। আমি সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যে তার পরিবারের সঙ্গে সেখান থেকে বেরিয়ে

আসার জন্য বিমানের টিকিট পেয়েছি কারফিউ জারি হওয়া সত্ত্বেও। সেখানে ইন্টারনেট আর মোবাইলের নেটওয়ার্ক বন্ধ রাখা আছে। একেবারেই সামান্য তথ্য সেখানে পৌঁছাচ্ছে এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু সেখানে ঠিক কী ঘটছে, তা আমি বলতে চাই।

তিনি বলেন, আমি কানাডায় জন্মগ্রহণ করেছি এবং সেখানেই বেড়ে উঠেছি। আমার মা-বাবা ১৯৯০ সালের দিকে কাশ্মীর ছেড়ে চলে আসেন। কারণ ওই জায়গাটা নিরাপদ নয়। কিন্তু এখন আমরা প্রতিবছর সেখানে ফেরার চেষ্টা করি।

তিনি আরো বলেন, চলতি বছরের জুলাইয়ে কাশ্মীরে যাই। সেখানে গিয়েই অনেক কিছু আলাদা মনে হচ্ছিল। বাবা আমাদের বলেছিলেন, গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ৩৫এ ধারা পরিবর্তন হবে। এই আইন বাতিল হলে কাশ্মীরের বাইরের মানুষ সেখানকার

জমি কিনতে পারবে। তবে মানুষজন ভাবতেও পারেনি যে ৩৭০ ধারা বাতিল হয়ে যাবে। আর আমরা ভাবিনি যে এভাবে কাশ্মীরের বড় মাপের নেতাদের আটক করা হবে।

তিনি আরো বলেন, কেউই ভাবতে পারেনি যে কারফিউ জারি করা হবে। কারণ সবাই ঈদ পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর মধ্যেই শোনা গেল কারফিউ। এটা চলবে অন্তত ১৫ আগস্ট পর্যন্ত।

তিনি আরো বলেন, ওইদিন আমি কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরে ছিলাম। দাদির ঘরেই দিনটা পার করলাম। সবকিছু ঠিকই ছিল। কিন্তু সেখান থেকে আমাদের বাসায় ফেরার পথে একের পর এক গুঞ্জন শুনলাম। মানুষ অনেক পরিমাণে খাবার কিনছিল। পার্কগুলোতে বহু মানুষ জমায়েত হয়েছিল। বাসের ছাদেও গাদাগাদি করে বসেছিল মানুষ। সবাই নিজ নিজ গন্তব্যে

পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল।

তবে কাশ্মীরের গভর্নর সবাইকে শান্ত থাকার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এসব গুজব। কিন্তু আমরা সবখানে অতিরিক্ত সেনাবাহিনীর উপস্থিতি লক্ষ করলাম। তাতেই মনে হচ্ছিল কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।

ভিড় হলেও কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছিল না। সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে কেউই নিজেদের নিরাপদ মনে করছিল না। এর আগেও কাশ্মীরে কারফিউ দেখেছি। কিন্তু এরকম পরিস্থিতি এর আগে ঘটতে দেখিনি। সে কারণে এবার ভয়ও পেয়েছিলাম।

রবিবারই জানা যাচ্ছিল, ২৪ ঘণ্টা কারফিউ থাকবে। এরই মধ্যে আমার বাবা বিমানের টিকিট কিনলেন। তিনি অবশ্য আমাকে জানাননি। আর যখন আমি বিষয়টি জানলাম, আমি যেতে রাজি হইনি। আমি হতাশ হয়ে যাই। কাশ্মীরে আমার বাড়ি। সেখান থেকে গুজবের কারণে তো আর

চলে যেতে পারি না। এটা আমার কাছে অপমানের মনে হয়েছে। এটা বেদনারও। তার পরেও বাবা টিকিট নিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, এর মধ্যে আবার আমার চাচাতো বোনের বাচ্চা হবে। সবমিলিয়ে আমরা সারারাত ঘুমাতে পারিনি। আমার বাবা সবথেকে বেশি চিন্তিত ছিলেন। তাকে এর আগে এ ধরনের চিন্তা করতে দেখিনি।

বাড়ি থেকে বের হওয়ার পাঁচ মিনিট পরেই সেনা তল্লাশির মুখে পড়ি আমরা। সেখানে বুহ মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার জন্য সেনা তল্লাশি চৌকির সামনে অপেক্ষায় ছিল। অনেকে গাড়ি করেও যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তাদের থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

কিছুদূর যাওয়ার পর আমরা আবার বিপদে পড়ি। সেনাবাহিনীর পতাকা দেখেও আমাদের গাড়ির চালক পার হয়ে গিয়েছিলেন। পরে তো সেনাবাহিনী আমাদের পথ রোধ করে। তারপর তো প্রায় মাথায় নল ঠেকানোর দশা। ভয়ে সাত অবধি বারবার গুণছিলাম।

আমার বাবা গাড়ি থেকে বের হয়ে নরম সুরে তাদের অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা সবাই ছিলেন চড়া মেজাজে। আর এটা অত্যন্ত ভীতিকর অবস্থা, যখন কোনো পরিবারকে প্রায় ৩০ জন সেনা অস্ত্র তাক করে ঘিরে রাখে। তার পর আরো অনেক বাধা পেরিয়ে অবশেষে গন্তব্যে পৌঁছেছেন এই তরুণী ও তার পরিবার।