ভারত সফরে তিন চ্যালেঞ্জ


প্রধানমন্ত্রী দিল্লি যাচ্ছেন আজ
অথর
ডোনেট বাংলাদেশ নিউজ ডেক্স   প্রধান মন্ত্রী কর্ণার
প্রকাশিত :৩ অক্টোবর ২০১৯, ৯:২২ পূর্বাহ্ণ
ভারত সফরে তিন চ্যালেঞ্জ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আজ নয়াদিল্লি যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সফরকালে প্রধানমমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ইন্ডিয়ান ইকোনমিক সামিটে অংশ নেবেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। বাংলাদেশ ও ভারতের সাধারণ নির্বাচনের পর দক্ষিণ এশীয় দুই নেতার এটাই প্রথম বৈঠক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এবারের দিল্লি সফরে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তিস্তা, এনআরসি, রোহিঙ্গা ইস্যু। বাংলাদেশ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ সফরে সীমান্তে হত্যা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী সহযোগিতা, বাণিজ্য, নৌপরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা, বিবিআইএম (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালকে নিয়ে গঠিত উপআঞ্চলিক জোট), অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত কাঠোমো চুক্তি, রোহিঙ্গা, উন্নয়ন, জ্বালানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা

হবে। যুব ও ক্রীড়া, সমুদ্র গবেষণা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাসহ কয়েকটি বিষয়ে বিনিময় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হবে। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনটি যৌথ প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন দুই নেতা। সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘টেগর পিস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি এ সফর নিয়ে গতকাল বুধবার সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বিস্তারিত জানান। তিনি জানান এ সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এনআরসি (নাগরিকপঞ্জি) ও তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি তুলে ধরা হবে।

আসামের বিতর্কিত এনআরসি বিষয়ে এ কে আবদুল মোমেন বলেন, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফরের সময় বলেছিলেন, ‘এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে না।’ গত

সপ্তাহে নিউইয়র্কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টি তুলেছিলেন। তখন মোদি বলেন, ‘আমাদের মধ্যে যে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে, সেখানে এসব ছোটখাটো বিষয় কোনো সমস্যা হবে না।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তবে ভারতের কোনো কোনো রাজনীতিবিদ উদ্যোগী হয়ে বিষয়টি তুলছেন। তিনি বলেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এনআরসি তৈরি করা হয়েছে। এটি করতে সময় লেগেছে ৩৪ বছর। ফাইনাল করতে কত সময় লাগবে, জানি না।

এনআরসি নিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করা হলেও এ বিষয়টি এখন বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। আসামে নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে এনআরসি করা হবে বলে ভারতের শাসক দল বিজেপি এবং তাদের সমমনা

দলগুলোর নেতারা বলে আসছেন। মূলত মুসলিম নাগরিকদের টার্গেট করে বলা হচ্ছে তারা ‘বাংলাদেশি’। নাগরিকপঞ্জিতে যারা ঠাঁই পাবে না, তারা অনুপ্রবেশকারী, তাদের ভারত থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ গত পরশুই বলেছেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী প্রত্যেককে নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য বিল পাস করাতে চলেছে সরকার। তবে এদের ছাড়া বাকি একজন অনুপ্রবেশকারীকেও ভারতে থাকতে দেওয়া হবে না।’ এর আগে আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের পর তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, এনআরসিতে ঠাঁই না হওয়া ২০ লাখ অনুপ্রবেশকারীকে অবশ্যই তাড়িয়ে দেওয়া হবে।

অবশ্য আসামের এনআরসি থেকে বাদপড়াদের বেশির ভাগই হিন্দু বাঙালি। এনআরসি ইস্যুতে আসামে যে নীতি

নিয়েছে বিজেপি সরকার, একই নীতি কিন্তু নেওয়া হচ্ছে না পশ্চিমবঙ্গে। হিন্দু হোক মুসলিম হোক আসামে টার্গেট বাঙালি। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে মূল টার্গেট মুসলিম জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের মানুষের কাছে বড় একটা সংশয় এনআরসি কি শুধুই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়, নাকি রোহিঙ্গাদের মতো রাষ্ট্রহীন মানুষের ভার বইতে হবে বাংলাদেশকে-
সংবাদ সম্মেলনে পানি সংক্রান্ত বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা তিস্তাসহ মোট ৮টি নদীর রূপরেখা কাঠামো নিয়ে আলোচনা করবো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন ভারত ও বাংলাদেশ বর্তমানে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক পার করছে বলে অনেকে মনে করেন। গত ১০ বছরে দুই দেশের মধ্যে শতাধিক চুক্তি হয়েছে, যার ৬৮টিই হয়েছে গত তিন বছরে। এ সময়ে কয়েক দশকের স্থলসীমান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হয়েছে, সমুদ্রসীমা নিয়েও বিরোধ কেটে গেছে দুই দেশের। কিন্তু বহুবছরের অমীমাংসিত এবং বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশিত তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে সমাধান আটকে আছে। এ ক্ষেত্রে বড় বাধা পশ্চিমবঙ্গের মমতা ব্যানার্জির সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের সফরে তিস্তা নিয়ে আলাপ হলেও তা মীমাংসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কেননা, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ বিজেপি।

রোহিঙ্গা বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চীনের উদ্যোগে আমরা ত্রিপক্ষীয় একটি বৈঠক করছি। ওই বৈঠকে চীনের পীড়াপীড়িতে মিয়ানমার মাঠপর্যায়ে একটি গ্রুপ তৈরি করায় রাজি হয়েছে। এই কমিটি প্রত্যাবাসনে কাজ করবে। এবারের ভারত সফরের এজেন্ডায় রোহিঙ্গাদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও এ নিয়ে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শেখ হাসিনার আলাপ হতে পারে বলে একটা কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মধ্যস্ততাকারীর ভূমিকায় চীন থাকলেও এশিয়ার দ্বিতীয় শক্তিধর ভারতের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চীনের মতো ভারতও এ সমস্যার আঞ্চলিক সমাধানের দিকে জোর দিয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট (বিজি-২০৩০) প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে আজ সকাল ৮টায় নয়াদিল্লির উদ্দেশে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করবে। ফ্লাইটটি স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় নয়াদিল্লি পৌঁছবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ দিন হোটেল তাজ প্যালেসের দরবার হলে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ইন্ডিয়া ইকোনমিক সামিটে বাংলাদেশের ওপর কান্ট্রি স্ট্র্যাটেজি ডায়ালগে যোগ দেবেন।

প্রধানমন্ত্রী একই দিন বাংলাদেশ হাইকমিশনের মৈত্রী হলে এক সংবর্ধনা এবং বাংলাদেশ হাউসে তার সম্মানে আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেবেন। বাংলাদেশের হাইকমিশনার এই নৈশভোজের আয়োজন করবেন।

প্রধানমন্ত্রী ৪ অক্টোবর ভারতের তিনটি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড এক্সচেঞ্জের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক ও মতবিনিময় করবেন। ভারত সফররত সিঙ্গাপুরের উপ-প্রধানমন্ত্রী হেং সোয়ে কিট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ৫ অক্টোবর শনিবার ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন কয়েকটি বিনিময় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হবে। দুই প্রধানমন্ত্রী হায়দরাবাদ হাউস থেকে যৌথভাবে কয়েকটি প্রকল্প উদ্বোধন করবেন।

এর আগে, একই দিন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। শেখ হাসিনা হায়দরাবাদ হাউসে আনুষ্ঠানিক ভোজসভায় যোগ দেবেন এবং পরিদর্শক বইতে স্বাক্ষর করবেন। এ সফরকালে ভারতের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগাল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। শ্যাম বেনেগাল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মের ওপর চলচ্চিত্র নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছেন। ৬ অক্টোবর দেশে ফিরবেন শেখ হাসিনা।