মৈমনসিংহ গীতিকার প্রণয়-প্রসঙ্গ


অথর
প্রবন্ধ ডেক্স   সাহিত্য আসর
প্রকাশিত :২৯ জুলাই ২০১৯, ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
মৈমনসিংহ গীতিকার প্রণয়-প্রসঙ্গ

“মৈমনসিংহ গীতিকা” বাংলা সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য সম্পদ। দীনেশচন্দ্র সেন [১৮৬৬-১৯৩৯] ১৯২৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দশটি পালা সমৃদ্ধ “মৈমনসিংহ গীতিকা” প্রকাশ করেন। এর ফলে স্বদেশ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্মোচিত হয় বাঙালির আত্মপরিচয়ের উৎস, ঐতিহ্য-সাংস্কৃতিক জীবনধারা, বাংলা সাহিত্যের অতীত ধন-ভা-ার; আন্দোলিত হয় বাঙালি সমাজ, প্রশংসা-বাণী লাভ করে রোঁমা রোলাঁ, সিলভ্যাঁ লেডি, স্যার জর্জ গ্রীয়ার্সন, উইলিয়াম রোদেনস্টাইন, স্টেলা ক্রামরিশ, ডি. এ্যালেন, এফ.এইচ ব্রাউনের মতো মনীষীদের কাছে।

“মৈমনসিংহ গীতিকা”-গুলোতে সমকালীন সমাজবাস্তবতার পাশাপাশি নর-নারীর প্রণয় সম্পর্কের স্পষ্ট চিত্র উপস্থাপিত। অধিকাংশ গীতিকাতে নর-নারীর ‘পরথম যইবন’ বা ‘নবীন যইবন’-এর প্রণয় শিল্পীর তুলিতে অঙ্কিত হয়েছে। “মৈমনসিংহ গীতিকা”র রচয়িতাগণ নারীর সৌন্দর্য বর্ণনা অপেক্ষা নর-নারীর প্রণয়াবেগ, প্রণয়যন্ত্রণা, পূর্বরাগ ও অনুরাগের

চিত্র অঙ্কনেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। গীতিকাগুলোতে নায়ক-নায়িকার প্রণয়ের উন্মেষ অভিন্নভাবে হলেওÑ প্রণয়ের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ চিত্রিত হয়েছে নানাভাবে। তবে গীতিকাসমূহে নারীর প্রণয়কে রচয়িতাগণ যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন- সে তুলনায় পুরুষের প্রেমকে তাঁরা সেভাবে চিত্রিত করেননি কিংবা করা সম্ভব ছিল না। এ-কারণে গীতিকাগুলোতে বিবর্তনের নানা পথ পেরিয়ে নারীচরিত্রের প্রণয় উন্নত-পবিত্র রূপ ধারণ করে আত্মত্যাগের গৌরবে মহীয়ান, বিরহে উজ্জ্বল দীপশিখা হিসেবে উন্মোচিত। অন্যদিকে পুরুষ চরিত্রগুলো আবেগের একটি নির্দিষ্ট সীমারেখায় বন্দী থেকেছে। তাছাড়া নারীর প্রণয়ের উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবির পাশে অঙ্কিত হয়েছে পুরুষ-চরিত্রের আত্মকেন্দ্রিক ব নার কাহিনি। এখানে একটি বিষয় অবশ্য স্মরণীয়- “মৈয়মনসিংহ গীতিকা”-সমূহে নর-নারীর প্রণয়াবেগে স্বাধীনমনস্কতা-আন্তরিকতা-বিশ্বস্ততা এবং একনিষ্ঠতার পিছনে ধর্মীয় উগ্রতামুক্ত পরিবেশ, ধর্মীয় অনুশাসন অপেক্ষা

হৃদয়াবেগের প্রাধান্য, বর্ণ-বৈষম্যের শিথিল বিন্যাস, সমন্বয়মূলক বৈষ্ণব ধর্ম প্রচারের প্রভাব সক্রিয় ছিল।

“মৈমনসিংহ গীতিকা”-য় নায়ক-নায়িকার প্রণয়ের বিকাশ ঘটেছে ফ্রয়েডীয় লিবিডোতত্ত্বের (মানুষের অবচেতন মনের অবদমিত যৌন আকাক্সক্ষাকে কেন্দ্র করে যেগুলো সৃষ্ট) পথধরে। অধিংকাশ গীতিকাগুলোতে নর-নারীর মনোদৈহিক আকাক্সক্ষা যৌবনকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে; অথবা অন্যভাবে বলা যায়- আদিম লিবিডো-কামনা-বাসনার অপ্রতিরোধ্য টানে গীতিকার নর-নারীরা কাছাকাছি উপনীত হয়েছে। গীতিকা-রচয়িতাগণ গীতিকার প্রথম পর্যায়ে যেভাবে অনুরাগের চিত্র এঁকেছেন তাতে মনে হয়- প্রণয়ের বিকশিত রূপ এ-গীতিকাগুলোতে দেহ বিচ্ছিন্ন নয়। গীতিকাগুলোতে নর-নারীর প্রণয়ের উন্মেষ ঘটেছে যৌবন-জোয়ারের রূপ-লাবণ্যের পুষ্প থেকে কামনার মধু স য়ের মাধ্যমে। দ্বিজ কানাই প্রণীত ‘মহুয়া’ গীতিকাতে মহুয়ার প্রতি নদের চাঁদের প্রণয়াকাক্সক্ষার সূচনাতে সক্রিয়ভাবে

কাজ করে মহুয়ার নব-যৌবনের রূপমাধুরী। মহুয়ার প্রতি এ-আকর্ষণকে চিত্রিত করা হয়েছে এভাবে :
মহুয়ার উক্তি : ‘কঠিন তোমার মাতাপিতা কঠিন তোমার হিয়া।
এমন যইবন কালে নাহি দিছে বিয়া ॥ [মৈ.গী. পৃ-১৭]
নদের চাঁদের উক্তি : ‘কঠিন আমার মাতাপিতা কঠিন আমার হিয়া।
তোমার মত নারী পাইলে করি আমি বিয়া ॥ [মৈ.গী. পৃ-১৭]
‘মলুয়া’ গীতিকাতেও বিনোদের প্রতি মলুয়ার যে প্রণয়ের

চিত্র প্রকাশ পেয়েছে- সেখানেও দেহসর্বস্বতার রূপ এবং দেহজ কামনায় প্রধান হয়ে উঠেছে। যেমন :
‘ভিন দেশী পুরুষ দেখি চান্দের মতন।
লাজ-রক্ত হইল কন্যার পরথম যৌবন ॥
………………………………………
শুইতে দিতাম শীতল পাটী বাটাভরা পান।
আইত যদি সোনার অতিথ যৌবন করতাম দান ॥ [মৈ.গী. পৃ-৪৭]
নয়ানচাঁদ ঘোষ প্রণীত ‘চন্দ্রাবতী’ গীতিকাতেও জয়ানন্দ যখন চন্দ্রাবতীর কাছে প্রণয়-বাসনা ব্যক্ত করে- তখনও যেন লিবিডো চেতনাই প্রধান হয়ে ওঠে :
‘দেখি শুনি সেই ভাল ফুল তুল্যা আনি।
বয়স হইয়াছে এখন হইলাম অরক্ষীনি॥
জৈবন আইল দেহে জোয়ারের পানি।
কেমনে লিখিব পত্র প্রাণের কাহিনী ॥ [মৈ.গী. পৃ-৮৮]
চন্দ্রাবতী প্রণীত ‘দেওয়ান ভাবনা’ গীতিকাতেও সুনাই এবং মাধবের প্রণয়পত্রেই রয়েছে ফ্রয়েডীয় দেহকামনার জটিল অভিব্যক্তি :
‘গলায় গাঁথিয়া দিবাম জোনাকীর মালা।
বাসরে শিখাইবাম কন্যা তোমায় রতিকলা ॥
…………………………………………
ধন দিবাম দৌলত দিবাম আর দিবাম পরাণ।
খুসী মনে করলো কন্যা মোরে যৌবন দান ॥ [মৈ.গী. পৃ-১৪৬]
‘কঙ্ক ও নীলা’ গীতিকায় নীলার মনোজগতে কঙ্কের প্রতি যে প্রণয়ের জোয়ার এসেছে- তা যেন নীলার যৌবন-জোয়ারেরই ঢেউ; সেই জোয়ারে প্রকাশ পেয়েছে দেহ-মন সঁেপ দেওয়ার আকুলতা :
‘তুমিরে ভমরা বন্ধু আমি বনের ফুল।
তোমার লাইগারে বন্ধু ছাড়বার জাতি-কুল ॥ [মৈ.গী. পৃ-২১৬]
ময়মনসিংহ অ লের উপভাষায় রচিত, নাটকীয় গুণসম্পন্ন ‘মহুয়া’ পালাটিতে প্রতিকায়িত হয়েছে তৎকালীন সমাজ-বাস্তবতা সমৃদ্ধ দুর্জয় প্রেমের অপূর্ব নিদর্শন। নদের চাঁদ সমাজগ-ি-জাতিবর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে মহুয়ার প্রেমে আত্মসমর্পণ, মহুয়ার দুর্জয় প্রেমশক্তি এবং পরিণামে করুণ-রসাত্মক কাহিনি পালাটিতে বর্ণিত হয়েছে। গীতিকাটির কাহিনি গড়ে উঠেছে বর্ণ ও শ্রেণিবৈষম্যমুক্ত বা অসাম্প্রদায়িক মানবিক প্রণয়কে কেন্দ্র করে। একদিকে ছয়-মাস বয়সী চুরি হওয়া কন্যা অনিন্দ্যকান্তি মহুয়া অন্যদিকে জমিদারপুত্র নদের চাঁদ। এ-পালার তথ্যানুসারে হুমরা বেদের দলের সাথে মহুয়া ‘তামসা’ দেখাতে বামনকান্দা গ্রামে উপস্থিত হলে নদের চাঁদ চান মহুয়ার প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়। তাদের প্রণয়ের বিস্তার ঘটেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে-রাতের আঁধারে :
‘সন্ধ্যা বেলায় চান্নি উঠে সূরুয বইসে পাটে।
হেন কালেতে একলা তুমি যাইও জলের ঘাটে ॥’ [মৈ.গী. পৃ-১৫]
এখানে উল্লেখ্য, “মৈমনসিংহ গীতিকা”য় প্রণয়সম্পর্ক সমূহ সংঘটিত হয়েছে প্রায়শ জলের ঘাটে, নদীতীরে এবং সন্ধ্যারাতের নির্জনতাকে ব্যবহার করে। গীতিকা রচয়িতাগণ সমাজবাস্তবতাকে মেনেই এ-জাতীয় অনুরাগের চিত্র এঁকেছেন। এর কারণ হিসেবে বলা যায়- গ্রামীণ পটভূমিতে যুবতী বা কুমারী নারীদের গৃহের বাইরে শুধু ¯জ্ঞান বা জল সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই বের হতো। তাছাড়া তৎকালীন সমাজগন্ডি ও পরিবারবৃত্তের মধ্যে অবিবাহিত নারী-পুরুষের প্রণয়বাসনা চরিতার্থ হওয়া অসম্ভব ছিল; প্রকাশ্যে কথা বলা কিংবা দেখা করা ছিল সমাজের চোখে নিন্দনীয়। তাই তাদের প্রণয়ের স্থান হিসেবে উঠে এসেছে নদীর তীর-জলের বা গাঙের ঘাট-সন্ধ্যারাত। ‘মলুয়া’, ‘চন্দ্রাবতী’, ‘কমলা’, ‘দেওয়ান ভাবনা’ প্রভৃতি গীতিকাতেও আমরা একই চিত্র লক্ষ করি :
‘মলুয়া’ গীতিকায় প্রতিফলিত চিত্র : ‘সাত ভাইয়ের বইন মলুয়া জল ভরিতে আসে।
সন্ধ্যাবেলা নাগর শুইয়া একলা জলের ঘাটে ॥
কাঁখের কলসী ভূমিত থুইয়া মলুয়া সুন্দরী।
লামিল জলের ঘাটে অতি তরাতরি ॥’ (মৈ.গী. পৃ-৪৫)
‘চন্দ্রাবতী’ গীতিকায় প্রতিফলিত চিত্র : ‘পরথমে হইল দেখা সুন্ধা নদীর কূলে।
জল ভরিতে যায় কন্যা কলসী কাকালে ॥
চলনে খঞ্জন নাচে বলনে কুকিলা।
জলের ঘাটে গেলে কন্যা জলের ঘাট লালা ॥
কে তুমি সুন্দরী কন্যা জলের ঘাটে যাও।
আমি অধমের পানে বারেক ফির‌্যা চাও ॥’(মৈ.গী. পৃ-৯১)
‘দেওয়ান ভাবনা’য় প্রতিফলিত চিত্র : ‘গাঙ্গের পারে হিজল গাছ লো চিড়ল চিড়ল পাতা।
জলের ঘাটে যাইও কন্যাগো কইবাম মনের কথা ॥
গাঙ্গের পারে আছে কন্যা কেওয়া পুষ্পের বন।
নিরালা বসিয়া করবাম গো প্রেম আলাপন ॥’ ( মৈ.গী. পৃ-১৪৫)
গীতিকা-রচয়িতাগণ স্থান-কাল-পাত্র স্মরণে রেখে অনুরাগের যে চিত্র এঁকেছেন তা তৎকালীন সমাজবাস্তবতারই ফসল। অন্যদিকে তাদের যেভাবে দেখা হয়েছে তাতে যেন বৈষ্ণব পদাবলীর অনুরাগের ছোঁয়া স্পষ্ট- এতে বোঝা যায় গীতিকা রচয়িতাগণের মনে বৈষ্ণবীয় প্রভাব সক্রিয় ছিল :
‘ধীরে ধীরে চল্যা কইন্যা নদীর ঘাটে আসি।
আইস্যা দেখে নদ্যার ঠাকুর বাজায় প্রেমের বাঁশি॥’ [মৈ.গী. পৃ-১৯]
নদের চাঁদ মহুয়াকে জলের ঘাটে পেয়ে তার মনের বন্ধদরজা খুলে প্রণয় নিবেদন করেছে। সরাসরি প্রণয়নিবেদনের নির্লজ্জতার প্রেক্ষিতে মহুয়া তার জলে ডুবে আত্মহত্যা করা উচিত বলে মনে করে। এর উত্তরে নদের চাঁদ যে উত্তর করে তা ব্যঞ্জনাধর্মী-অর্থদ্যোতনার সৃষ্টি হয়-
‘কোথায় পাব কলসী কইন্যা কোথায় পাব দড়ী।
তুমি হও গহীন গাঙ্গ আমি ডুব্যা মরি ॥’ [মৈ.গী. পৃ-১৭]
নদের চাঁদ এবং মহুয়ার অদম্য প্রেম সকল বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এগিয়ে যেতে চেয়েছে; যেখানে তারা জাতি-বর্ণকে তুচ্ছ করে একে-অপরের একে-অপরের সাথে মৃত্যুপণ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্তে অনড়। নদের চাঁদের মধ্যে সমাজ-ধর্ম-মোহকে অতিক্রম করার চিত্র লক্ষ করা যায় :
‘তোমার লাগিয়া কন্যা ফিরি দেশ বিদেশে।
তোমারে ছাড়িয়া কন্যা আর না যাইবাম দেশে॥
কী কইবাম বাপ মায়ে কেমনে যাইবাম ঘরে।
জাতি নাশ করলাম কন্যা তোমারে পাইবার তরে॥॥
তোমায় যদি না পাই কন্যা আর না যাইবাম বাড়ি।
এই হাতে মার লো কন্যা আমার গলায় ছুরি॥ [মৈ.গী. পৃ-২৬]
কিন্তু বেদে সর্দার হুমরা সামাজিক, বৈষয়িক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে এ প্রেমের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে নানা প্রতিকূলতা ডিঙিয়েও মিলনপিয়াসী দুটি মানব হৃদয় শেষ পর্যন্ত কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়। মৃত্যুই হয় তাদের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি; তাদের মৃত্যু সংঘটিত হয়েছে বেদে দলের গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে। ভালোবাসার অমলিন স্মৃতি জাগিয়ে রেখে দুজনেই শায়িত হয় এক কবরে। এখানে স্মরণীয়, দ্বিজ কানাই মধ্যযুগের কবি। পূর্ব ময়মনসিংহ অ লের অধিবাসী। দ্বিজ কানাই এক অসবর্ণ তরুণীর প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়ে গভীর দুঃখ ভোগ করেন বলে শোনা যায়। তাঁর সম্পর্কে যে প্রবাদ প্রচলিত তাতে জানা যায়, তিনি বর্ণবিভক্ত সমাজে উচ্চবর্ণ তথা ব্রাহ্মণশ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হলেও নিম্নবর্ণ অর্থাৎ শূদ্রশ্রেণির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ‘মহুয়া’ পালা রচনায় তাঁর যে উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে তার মূলে তাঁর ব্যক্তি জীবনের সংস্কারমুক্ত মানবিক বোধ সক্রিয় বলে ধারণা করা হয়।

“মৈমনসিংহ গীতিকা”-র রচয়িতাগণ প্রণয়াকাক্সক্ষার সাথে সতীত্ব-চিন্তার বিকাশকে সম্পর্কযুক্ত করেছেন। ‘অবাঞ্ছিতজনের কামলালসার নিকট আত্মসমর্পণ করলে সতীত্বহানি ঘটে, কিন্তু বাঞ্ছিতজনের নিকট দেহমন সমর্পণে সতীত্বহানির কারণ হয় না- এ জাতীয় সতীত্ব-চিন্তাই ময়মনসিংহের গীতিকার নায়িকাদের মনে সক্রিয় ছিল।’ (আজিজুল, ২০০৩ : ৯৬) এ জাতীয় বোধ থেকেই ‘মহুয়া’ গীতিকাতে মহুয়া সব প্রতিবন্ধকতা-প্রলোভন থেকে নিজেকে রক্ষা করে নদের চাঁদের জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনেছে; ‘মলুয়া’ গীতিকাতে মলুয়া তার অন্তরে চান্দ-বিনোদের জন্য ভালোবাসা বাঁচিয়ে রেখেছে কাজি, দেওয়ান ও ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

‘চন্দ্রাবতী’ গীতিকাতে প্রণয়-ভাবনার একটি ভিন্ন রূপ উপস্থাপিত। আবাল্য সাথী জয়ানন্দ এবং চন্দ্রাবতী পরস্পরকে ভালোবাসলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আর ভালোবাসার ঘর বাঁধা হয়নি- বিয়োগান্তক পরিণতি যেন তাদের ভবিতব্য। জয়ানন্দ আবাল্য সাথী চন্দ্রাবতীর প্রতি অনুরাগকে পরিণতি দিতে চন্দ্রাবতীর বাড়িতে ঘটক পাঠিয়ে বিয়ের-ক্ষণ স্থির করে। কিন্তু ইত্যবসরে সুন্ধা নদীর কূলে সোনার বরণ তনু এক মুসলিম কন্যার দেখে তার প্রতি আসক্ত হয়। রূপ লালসার জয়ানন্দ এত উন্মত্ত হয়ে ওঠে যে, সে চন্দ্রাবতীর সাথে বৈবাহিক বন্ধনে প্রতিশ্রুত হয়েও চন্দ্রাবতীকে ত্যাগ করে। প্রণয়লাঞ্ছিত-যন্ত্রণাদগ্ধ চন্দ্রাবতী জয়ানন্দকে ভুলতে, হৃদয়চা ল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পিতৃ-আজ্ঞা শিরোধার্য করে ধর্মনিষ্ঠায় ব্রতী হয়। ‘যৈবনে যোগিনী’ হয়ে ওঠা সংস্কারাচ্ছন্ন চন্দ্রাবতী কঠোর ধর্মসাধনার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েও ভুলতে পারেনি স্বীয় প্রণয়স্বপ্নকে। অন্যদিকে বিস্মৃতির কাল শেষ হলে রূপলালসায় মোহাবিষ্ট ও ধর্মান্তরিত জয়ানন্দ আবার ফিরে এসেছে চন্দ্রাবতীর কাছে- কিন্তু চন্দ্রাবতী তখন আর জয়ানন্দের ডাকে সাড়া দেয়নি। জয়ানন্দ শেষ পর্যন্ত নদীর জলে আত্মবিসর্জন দেয়। এখানে স্মরণীয়, জয়ানন্দের ফিরে আসার মধ্যে গভীর প্রণয়াবেগের পরিচয় স্পষ্ট হলেও- তার আত্মবিসর্জনে কোনো গৌরব খুঁজে পাওয়া যায় না। নদীজলে জয়ানন্দের মৃতদেহ দর্শনে চন্দ্রাবতীর সজল-উন্মাদিনী রূপ অঙ্কনের মধ্য দিয়ে গীতিকা রচয়িতা জয়ানন্দের প্রতি চন্দ্রাবতীর গোপন প্রণয়কেই প্রতিকায়িত করেছেন- যা কোনো ধর্মীয় বিধি-নিষেধ বা সমাজ-সংস্কারের অধীন নয় :
‘আঁখিতে পলক নাহি মুখে নাই সে বাণী।
পারেতে খাড়াইয়া দেখে উমেদা কামিনী ॥’ [মৈ.গী. পৃ- ৯৭]

দ্বিজ ঈশান প্রণীত ‘কমলা’ গীতিকাতে মানিক চাকলাদারের সুলক্ষণা কন্যা কমলা, গৃহভৃত্য নিদান এবং জমিদারপুত্র প্রদীপকুমারের ত্রিভূজ-প্রণয়ের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। কমলার প্রতি নিদানের যে প্রণয় তাতে সংকীর্ণতা, দেহজকামনা এবং রূপলালসা প্রধান হয়ে উঠেছে; অন্যদিকে প্রদীপকুমারের প্রেমে ঔদার্য, প্রকৃত প্রণয়ের অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। আলোচ্য গীতিকার রচয়িতা তাদের দুজনের প্রণয়ের চিত্র এঁকেছেন এভাবে :
নিদানের প্রণয়-বাসনার চিত্র : ‘র্কিপা কইরা কন্যা একবার চাও মোর পানে।
পরানে বাচাও মোরে ভরা যৌবন দানে ॥
আমার যা আছে তোমর সব কৈনু দান।
তোমার লাগিয়া পারি ত্যাজিতে পরাণ॥
তুমি আমার ধর্ম কর্ম তুমি গলার মালা।
তোমারে না দেখলে আমার মন হয় যে উতালা ॥’ [মৈ.গী. পৃ- ১০৭]
প্রদীপকুমারের প্রণয়-বাসনার চিত্র : ‘বাগ-বাগিচা ফুলের শোভা চক্ষে নাহি লাগে।
পাগল হইয়াছি কন্যা তোমার অনুরাগে ॥
তুমি আমার চন্দ্রসূর্য্য তুমি নয়নতার।
তুমি আমার মণিমুক্তা তুমি গলার হার ॥
তিলেক ছাড়িয়া তোমায় নাহি বাচে প্রাণ।
তোমারে না পাইলে কন্যা ত্যাজিব পরাণ ॥ [মৈ.গী. পৃ- ১০৭]
উভয়ের প্রণয়-বাসনার অভিব্যক্তি প্রায় এক হলেও নিদানের প্রণয়ে ইন্দ্রীয়জমোজ এবং প্রদীপকুমারের প্রণয়ে ইন্দ্রিয়াতীত মোহ বেশি সক্রিয়। কমলা চিকন গয়লানীর মাধ্যমে প্রেরিত নিদানের প্রণয়-প্রার্থনাকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। অবশ্য কমলার এই প্রত্যাখ্যানের পিছনে সক্রিয় থেকেছে শ্রেণিঅবস্থান : ‘বাড়ীর চাকর হইয়া এত বুকের পাটা।/ পায়ের গোলাম হইয়া শিরে উঠতে চায়।’ কমলার প্রেম-প্রত্যাখ্যান নিদানকে প্রতিহিংসা-পরায়ণ করে তোলে : ‘ছারকার করব চাকলা সাত দিনের আড়ি ॥’ গৃহভৃত্য নিদানের নেতিবাচক ভূমিকায় কমলাদের পারিবারিকজীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। প্রথম পর্যায়ে নিদানের প্রণয়বাসনা প্রত্যাখ্যানে কমলা চরিত্রের সংকীর্ণ মানসিকতা ফুটে উঠলেও পরবর্তী সময়ে প্রদীপকুমারের আগমনে তার চরিত্রের ব্যক্তিত্বময়তা ও আত্মমর্যাদাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরিশেষে কমলার বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকাই তাদের পুরনো প্রতিপত্তি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করেছে। তবে অন্যান্য গীতিকার মতো ‘কমলা’ গীতিকাটি প্রণয়-সম্পর্ক বিয়োগান্তক পরিণতি নয়Ñ মিলনাত্মক পরিণতি লাভ করেছে।

‘দেওয়ান ভাবনা’ গীতিকাতে প্রণয়ে একনিষ্ঠা, বিশ্বস্ততা ও কর্তব্যবোধের পরিচয় স্পষ্ট। কৈশোরে পিতৃহীন-ব্রাহ্মণ মাতুল ভাটুক ঠাকুরের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠা সুনাই সাথে জমিদার পুত্র মাধবের প্রণয়ের চিত্র আমরা এ-গীতিকাতে পাই। উল্লেখ্য, নিস্ততরঙ্গ গ্রামীণ জীবনপ্রবাহে জোতদারশ্রেণি যেমন সাধারণ মানুষের বৈষয়িকজীবনকে বিষিয়ে তুলেছে- তেমনি তারা নর-নারীর প্রণয়জগতকে করেছে আতঙ্কিত-বাঁধাগ্রস্ত। এ-গীতিকাতেও আমরা লক্ষ্য করি সুনাই এবং মাধবের প্রণয়ে বাঁধা হয়ে এসেছে ভাটুক ঠাকুরের বিষয়লোভী-মানসিকতা এবং দেওয়ান ভাবনার যৌনলালসা। ভাটুক ঠাকুরের সম্মতিতে দেওয়ান জলের ঘাট থেকে সুনাইকে অপহরণ করে। কিন্তু সুনাই নিজের বিপদকালেও প্রণয়ীর বিপদাশঙ্কায় অস্থির থেকেছে :
‘আসিব বলিয়া বন্ধু না আসিল কেরে।
না জানি পরাণের বন্ধু পড়িল কি ফেরে ॥
না আইল না আইল বন্ধু ক্ষতি নাই সে তাতে।
না জানি বিপদে বন্ধু পড়িল কি পথে ॥
বিষম নদীর ঢেউরে অলছতলছ পানি।
কি জানি পন্থেতে বন্ধুর ডুবছে নাও খানি ॥ ’ [মৈ.গী. পৃ-১৪৯]
এক্ষেত্রে মাধবের সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা, সুনাই-এর বুদ্ধিমত্তা তারা বিপদ থেকে রক্ষা পায় এবং বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। তবে, গ্রামীণ শোষকদের ছকে-বাঁধা জীবন থেকে সুনাই-মাধব নিজেদেরকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারেনি। দেওয়ানের চক্রান্তে প্রথমে বন্দী হয় মাধবের বাবা, এরপর মাধব; মাধবকে উদ্ধার করতে গিয়ে বন্দী হয় সুনাই। শেষ পর্যন্ত সুনাই স্বামী-মুক্তির পরে ‘বিষবড়ি’ খেয়ে আত্মবিসর্জনের মাধ্যমে ট্র্যাজিক পরিণতিকেই বরণ করেছে। সুনাই মাধবকে মুক্ত করে নিজেকে দেওয়ানের কাছে সঁপে দিয়েছে কিন্তু সে তার সতীত্বকে বিসর্জন দেয়নি- এখানেই তার প্রেমের শক্তি প্রকাশ পেয়েছে। ‘কঙ্ক ও লীলা’ গীতিকাতে আমরা প্রায় কাছাকাছি একটি চিত্র পাই- কঙ্ককে বিষ মেশানো ভাত খেতে না দেওয়ার পিছনে লীলার প্রেমের দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে।

“মৈমনসিংহ গীতিকা”র রচয়িতাগণ নর-নারীর প্রণয়ের মোহনীয় রূপ অঙ্কন করেছেন স্বল্প রেখায়- অন্যদিকে তাদের বিচ্ছেদ যন্ত্রণার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে দীর্ঘরেখায়। এজন্য গীতিকাগুলোতে প্রণয়ের সুখসুর অপেক্ষা বিচ্ছেদের করুণরাগিণীই অধিকমাত্রায় বেজে উঠেছে। তবে গীতিকারচয়িতাগণের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ক্রীয়াশীল ছিল বলেই নর-নারীর প্রণয়-সম্পর্ক চিত্রণে তার স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ করা যায়। স্বীয় প্রণয়াকাক্সক্ষার পটভূমিতে পতি বা প্রণয়ী নির্বাচনে বিশ্বস্ত-স্বাধীনমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি চরিত্রগুলোর ব্যক্তিত্বচিন্তার বা স্বাতন্ত্র্যচেতনার বিকাশ ঘটিয়েছে; চরিত্রগুলোর এ জাতীয় বিকাশ বা স্বাতন্ত্রচেতনার উৎস হিসেবে উল্লেখ করা যায় প্রণয়-প্রতিশ্রুতিকে। তাছাড়া চরিত্রগুলোর সক্রিয়তা, একনিষ্ঠতা এবং দৃঢ়চিত্ত আচরণের পিছনে যে প্রণয়-ভাবনা সক্রিয় ছিল তা স্পষ্টভাবে গীতিকাসমূহে উপস্থাপিত হয়েছে। যদিও অধিকাংশ গীতিকার চরিত্রসমূহ সামাজিক বেড়াজাল ছিন্ন করে মিলিত হতে পারেনি, যদিও চরিত্রসমূহ অচরিতার্থ প্রণয়-আকাক্সক্ষা নিয়ে বিয়োগান্তক পরিণতিকেই বরণ করেছে তবুও- তাদের প্রেমনিষ্ঠা এবং আত্মত্যাগ “মৈমনসিংহ গীতিকা”কে মহিমান্বিত করে তুলেছেন।

লেখক –
ড. মোঃ আব্দুর রশীদ
সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান
সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ, চুয়াডাঙ্গা
মুঠোফোন : ০১৯৬৬-৬৩১০৪২

তথ্য নির্দেশ :
শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন সংকলতি, সৈয়দ আজিজুল হক সম্পাদিত (২০১২)। মৈমনসিংহ গীতিকা। মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
সৈয়দ আজিজুল হক (২০০৩)। মৈমনসিংহ গীতিকা : জীবনধর্ম ও কাব্যমূল্য। অবসর, ঢাকা।