যশোরে লাশ নিয়ে থানার বাণিজ্য: আসামি ধরা ছোঁয়ার বাইরে


অথর
শোয়াইব হোসেন ব্যুরো অফিস   যশোর, খুলনা
প্রকাশিত :১২ জুন ২০১৯, ১২:১৫ অপরাহ্ণ
যশোরে লাশ নিয়ে থানার বাণিজ্য: আসামি ধরা ছোঁয়ার বাইরে

যশোরের শার্শা উপজেলার গোগা গাজিপাড়া গ্রাম থেকে শাহা পরান (১২) নামে এক হেফজখানার (হাফিজিয়া) ছাত্র হত্যার ৯ দিন পার হলেও মূল আসামি হেফজখানার শিক্ষক হাফেজ হাফিজুর রহমানকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারিনি শার্শা থানা পুলিশ। উপরন্তু প্রধান আসামিকে আটকের তদন্তের নামে নিরীহ নারী পুরুষদের বাড়ি থেকে থানায় নিয়ে ৩ দিন আটকের পর তিন লাখ টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার কথা স্বীকার করেছেন প্রধান আসামি হাফিজুর রহমানের নিরীহ আত্মীয় স্বজনেরা।

ভুক্তভোগী আত্মীয়রা জানান, ওয়াহেদের মাধ্যমে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদেরকে ছেড়ে দেয়ার চুক্তি হয়। ৩ লাখ টাকা ঈদের দিন দিলে শার্শা থানা তাদেরকে রাতে ছেড়ে দেয়। বাকী ৩ লাখ টাকা ঈদের পরে দেওয়া হয়।

ঘটনা জানার পর সরেজমিনে ভুক্তভোগী নিরীহ আত্মীয় শার্শার ডুবপাড়া গ্রামের মসজিদের ইমাম ও হত্যা মামলার পলাতক আসামি হাফিজুর রহমানের ভগ্নিপতি হেদায়েত উল্লাহ(৫০) এর বাড়ি গেলে তিনি এই অভিযোগ সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন।

হেদায়েত উল্লাহসহ তার বাড়ির ৩ জন গৃহবধু জানান, ২ জুন প্রধান আসামিকে ধরার জন্য তাদের বাড়ি থেকে তার স্ত্রী রেশমা খাতুন (৩৫), মুক্তাসুন বিল্লাহ এর স্ত্রী চায়না বেগম (২৫), হাফিজুর রহমানের স্ত্রী হাসিনা বেগম (২৮)সহ চারজন ও যশোর চৌগাছা থেকে মোনাইম (৪৫) নামে আরো একজনকে শার্শা থানা পুলিশ ধরে নিয়ে আসে। তারপর থেকে তদন্তের নামে তাদেরকে বিভিন্ন কৌশলে প্রধান আসামির অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এভাবে দুইদিন অতিবাহিত হলে আমাদের এই হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ততা না থাকার কারণে ছেড়ে দেওয়ার টালবাহানা করতে থাকে পুলিশ। পাশাপাশি চলে অর্থের মাধ্যমে লেনদেনের বিষয়টি।

হেদায়েত উল্লাহ বলেন, তার ভগ্নিপতি ওয়াহেদ ডুবপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ওসমান ও ইসরাফিলের কাছ থেকে মাঠের জমি বিক্রির অগ্রীম নগদ ৩ লাখ টাকা এনে শার্শা থানার দালাল সৈয়দ আলীর(সৈয়দা) মাধ্যমে শার্শা থানার এসআই মামুনের নিকট ৩ লাখ টাকা দিলে ঈদের দিন বিকালে ৩ জন মহিলা ও ঈদের দিন রাতে এশার নামাজের পর আমাদের দুইজনকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়। ঈদের পর আরো ৩ লাখ টাকা শার্শা থানায় দিতে হবে ও আসামি হাফিজুরের অবস্থান যদি তারা জানতে পারে সেই তথ্য থানাকে দিতে হবে এই শর্তে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়।

শার্শা থানার দালাল নামে পরিচিত সৈয়দ আলী বলেন, আমি মাঝে মাঝে থানার বিভিন্ন কাজ করে দেই বিধায় এই খুনের আসামি হাফিজুরের আত্মীয় হেদায়েত উল্লার পরিবারকে শার্শা থানার এসআই মামুন আমার জিন্মায় ছেড়ে দেয়। তিনি অর্থ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন, তিনি বলেন, হেদায়েত উল্লাহ মিথ্যা বলেছে, তিনি তো শার্শা থানার কোন অফিসার নয় আবার কোন অর্থ গ্রহণ করেনি তবে কেন তার জিম্মায় হেদায়েত উল্লাহসহ পাঁচজনকে ছেড়ে দেওয়া হলো ও থানা থেকে মুক্তির জন্য জমি বিক্রির অর্থ তাহলে কোথায় গেলো এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারিনি।

হেদায়েত উল্লাহর ভগ্নিপতি ওয়াহেদের সাথে মুঠোফোনে কথা বললে তিনি বলেন, ওসমান ও ইসরাফিলের কাছ থেকে হেদায়েত উল্লাহসহ ৫ জন আটকের দিনে নগদ ৩ লাখ টাকা ও ঈদের পর রোববার আরো ৩ লাখ টাকা ইসলামী ব্যাংকের চেক নিয়ে আসি। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ভয়েতে দালালরা আবোল তাবোল আপনাদেরকে বলেছে।

ডুবপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ওসমান ও ইসরাফিল ঈদের আগে ও পরে হেদায়েত উল্লাহর ৫ শতক জমি বিক্রির ৬ লাখ টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

মৃত শাহা পরানের বাবা শাহাজান আলী মূল হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, তারা গরীব বলে তার সন্তানের তদন্ত ধীর গতিতে চলছে। আসামী আটকে পুলিশ গড়িমসি করছে।

এ ব্যাপারে শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এম মশিউর রহমান বলেন, প্রধান আসামীকে দ্রুত গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করি খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আপনাদের সু-সংবাদ দিতে পারবো। তিনি হেদায়েত উল্লাহর পরিবারকে থানা থেকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করেন। যদি কেউ অর্থ নিয়ে থাকে তবে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান।

যশোরের নাভারন সার্কেলের এএসপি জুয়েল ইমরান বলেন, আসামি খুবই চালাক। ক্ষণে ক্ষণে তার অবস্থান পরিবর্তন করছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তাকে আটক করা যাবে বলে তিনি সাংবাদিকদের জানান। হেদায়েত উল্লাহর পরিবারের কাছ থেকে মুক্তির জন্য অর্থ নেওয়ার কথা তার জানা নেই, কেউ এ ব্যাপারে অভিযোগ দিলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

উল্লেখ্য, গত ২ জুন বিকালে শার্শার গোগা গাজিপাড়া গ্রাম থেকে হেফজখানার শিক্ষক হাফেজ হাফিজুর রহমানের তালাবদ্ধ ঘরের খাটের নীচ থেকে শাহা পরাণ (১২) নামে এক মাদ্রাসা ছাত্রের অর্ধ গলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শাহা পরাণ বেনাপোল পোর্ট থানার উত্তর কাগজপুকুর গ্রামের শাহাজান আলীর পুত্র ও কাগজপুকুর খেদাপাড়া হেফজখানার ছাত্র। এ ঘটনার তিনদিন আগে তাকে নিয়ে গ্রামে আসে হাফিজুর রহমান। মাঝে মাঝে ওই হেফজখানার অনেক ছোট ছোট ছাত্রদের সাথে করে বাড়ি নিয়ে বলাৎকারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পুলিশ ধারনা করছে, বলাৎকারের পর তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে পালিয়ে যায় হাফিজুর। এ ঘটনায় নিহতের পিতা শাহাজান আলী বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

No Comment.