শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের অন্তরায় ও প্রতিকার।


অথর
পাঠক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :৩১ মার্চ ২০১৯, ১:৫৮ পূর্বাহ্ণ
  • 53
    Shares
শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের অন্তরায় ও প্রতিকার।

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশর শিক্ষার নিম্নমানের কথা বিশিষ্টজনদের মুখে মুখে। এমনকি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সহ মন্ত্রী এমপিরাও শিক্ষার মানোন্নয়নে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষার মানোন্নয়নের অঙ্গীকার করা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের বিশেষজ্ঞদের মতে ১১ বছরের শিক্ষার্থীর সাড়ে চার বছর নেই। তাহলে উচ্চশিক্ষা সমাপ্তিতে কতটা সময় অপচয় হচ্ছে, তা গবেষণার বিষয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্নীতি, প্রশ্ন ফাঁস, জিপিএ বিক্রি,নোট, গাইড, প্রাইভেট, কোচিং, সৃজনশীল ও এমসিকিউ পদ্ধতিতে বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা আসলে প্রথমেই জাতি বিনির্মাণের নিপুণ কারিগর শিক্ষকদের প্রসঙ্গ চলে আসে। ইতিপূর্বে কোন সরকারই শিক্ষকদের জীবন মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে

বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অভাবে ও আমলাদের বিদ্বেষী মনোভাবের কারণেই। দেশের প্রতিটি বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষকদের বৈষম্য দূরীকরণে কোন বরাদ্দ দেয়া হয়নি বাঁ হচ্ছে না। শিক্ষা খাতের বাজেট বরাদ্দের ৭০%/৮০% বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের নামে ব্যয় দেখানো হয় অথচ শিক্ষকদের জীবন মানোন্নয়নে কোন বরাদ্দ থাকে না। শিক্ষা আদান-প্রদান একটি জটিল প্রক্রিয়া যেখানে শিক্ষক শিক্ষার্থী উভয়কে থাকতে হয় দুঃচিন্তামুক্ত ও নিরুদ্দিগ্ন। সরকারের অঙ্গীকার শিক্ষার মানোন্নয়নের,এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নকারী হচ্ছেন সম্মানিত শিক্ষকগণ। সুতরাং দ্রুত শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে সরকারকেই।

জাতীয় শিক্ষানীতি-১০ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। শিক্ষানীতি প্রণয়নের

পর দীর্ঘ ৯টি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ২৫% বাস্তবায়ন করতে পারেনি মন্ত্রনালয়। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, অথচ শিক্ষাব্যবস্থার নেই কোন আইনি কাঠামো। শুধুমাত্র প্রজ্ঞাপন, গেজেট ও পত্রাদেশ এর মাধ্যমে একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। শিক্ষকতা পেশাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে অনাকর্ষণীয় করে রাখার কারণেই শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হচ্ছে না মেধাবীরা। যেখানে একজন পিয়নের চেয়ে একজন উচ্চ শিক্ষিত শিক্ষকের বেতন ভাতা কম, সে কারণেই মেধাবীরা শিক্ষকতায় আকৃষ্ট হচ্ছে না। সামাজিক বাস্তবতার সাথে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একসময় শিক্ষকতা মহান ব্রত বাঁ সেবা ছিল, এখন আর তা নেই। পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষকতা এখন পেশার পাশাপাশি সেবা। শিক্ষকদের অভুক্ত উদরে রেখে

মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০১৯/২০২০ অর্থ বছরের বাজেটে শিক্ষকদের আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দিতে জাতীয় বাজেটের নূন্যতম ২০% বরাদ্দ দিতে হবে।

বহু পূর্ব থেকেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়নে সরকারের নজর আকৃষ্ট করতে বারংবার চেষ্টা করছেন শিক্ষকরাই। আমাদের শিক্ষার হার সংখ্যাগত বেড়েছে, সাথে সাথে বেড়েছে বেকারত্ব। একদিকে সরকার সুনাম কুড়িয়েছেন, অন্যদিকে যেনতেনভাবে সনদ অর্জনে আগ্রহীদের দৌরাত্ম বেড়েছে। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করে ব্যবসা কুড়াচ্ছে। সৃজনশীল ও নৈব্যক্তিক প্রশ্ন পদ্ধতি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে।
আমাদের শিক্ষার গুণগত মান যদি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে শিক্ষিত বেকারের হারও বৃদ্ধি পাবে। বাস্তবতার নিরিখে ও জাতির আশাআকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের

জন্য যুগোপযোগী শিক্ষাদান পদ্ধতি ও কারিকুলাম প্রণয়ন করা উচিত। গুণগত মানের শিক্ষক নিয়োগ ও বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কর্মরত শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে সহায়ক দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকদের যথাযথ সম্মান, মর্যাদা ও আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা দিতে হবে। দেশের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে লেখাপড়া মান ভালো ও সন্তোষজনক এমন মতামত সবার। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নৈতিকতা সমৃদ্ধ আলোকিত এবং মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন। শিক্ষকরাই পারেন প্রগতিশীল ও নৈতিকতায় গুণান্বিত প্রকৃত মানুষ গড়ে তুলতে। সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে বৈষম্য রেখে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অসম্ভব। শিক্ষকদের বঞ্চনা বৈষম্য দূর করতে সরকারকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা উচিত। আগামী প্রজন্মকে গুণগত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা না হলে তারা দেশের উন্নয়নে প্রকৃত ভূমিকা রাখতে পারবে না। শিক্ষকরাই পারেন উন্নত বাংলাদেশ গড়তে একটি সুশিক্ষিত ও মেধাবী জাতি উপহার দিতে।

শিক্ষকরা জাতির বিবেক ও সমাজের প্রাণ। দেশ-জাতি-সমাজ-রাষ্ট্রের দুঃসময়ে শিক্ষকরাই শিশুর সুপ্ত প্রতিভার উন্মেষ ঘটিয়ে দুঃসময়ের কাণ্ডারি হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করেন। পৃথিবীতে বিভিন্ন পেশার মধ্যে সর্বাধিক সম্মানজনক পেশা হচ্ছে শিক্ষকতা। বই কিনে যেমন কেউ দেউলিয়া হয়নি, তেমনি শিক্ষকদের পিছনে বিনিয়োগ করেও সরকারের দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই সরকারি-বেসরকারি উভয়ের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ ও সামঞ্জস্য বিধানে সমাধান করা খুবই জরুরি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষের শিক্ষার অধিকার সুরক্ষায় এবং আধুনিক বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ সময়োপযোগী যৌক্তিক দাবি। দেশের মানুষের এই যৌক্তিক দাবি যত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে, দেশও তত দ্রুতই এগিয়ে যাবে উন্নতির অভিষ্ট লক্ষ্যে। গুণগত মানের শিক্ষায় শিক্ষিত আদর্শিক জনগোষ্ঠী তৈরির মাধ্যমে অব্যাহত থাকুক সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রা, সেই প্রত্যাশায়।

মোঃ সাইদুল হাসান সেলিম
সভাপতি
বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী ফোরাম