শিক্ষার্থীরা নেই পড়ার টেবিলে


অথর
শিক্ষক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :৫ এপ্রিল ২০১৯, ৩:৫৩ অপরাহ্ণ
  • 243
    Shares
শিক্ষার্থীরা নেই পড়ার টেবিলে

একসময় ভোরবেলা প্রায় সব ঘর থেকে শিক্ষার্থীদের মাথাকুটে পড়ার আওয়াজ শোনা যেত। এখন সেই আওয়াজ প্রায় শোনাই যায় না! কেন শোনা যায় না এমন প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, ছাত্রছাত্রীরা পড়ার টেবিলে থাকলে তো পড়বে এবং পড়লেই তো শোনা যাবে পাঠের আওয়াজ।

সত্যি ছাত্রছাত্রীরা এখন আর পড়ার টেবিলে নেই। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় তারা থাকে পথে, কোচিং সেন্টারে, স্যারদের বাসায়, প্রাইভেট-টিউশনের ফাঁকে কিছু সময় ক্লাসে। রাতের বেলা তারা থাকে ক্লান্ত, ঘুমানোর আগ পর্যন্ত টিভি-ফেসবুক-ইউটিউবে ব্যস্ত। ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সবার অবস্থা এক।

গত এক বছর জেলা শহরের প্রধান একটি সরকারি কলেজের একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির শতাধিক শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন কার্যসূচি ও জীবনযাপনের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়ে তাদের সম্পর্কে কিছু ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক তথ্য পেয়েছি। যেমন, পড়ার টেবিলের সাথে দূরত্ব, মূল টেক্সট আত্মস্থ না করা, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগহীন উপস্থিতি, নিজের ওপর আস্থাহীনতা এবং নিয়মিত খাওয়া-দাওয়া না করা। এছাড়া আছে সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং বিশ্রামহীনতা।

দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎপাদন খাতের বিপরীতে সেবা খাত এখন অধিক চাঙা। বাণিজ্যিক সেবার পরিধি এখন সর্বব্যাপ্ত। মানুষের এখন রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়ার দরকার হয় না। সার্ভিস প্রোভাইডাররা খাবার ঘরে পৌঁছে দিয়ে যায়। চাল-ডাল-নুন-তেলও কেনা যায় ঘরে বসে। যে কাজ নিজ হাতে করার কথা সে কাজ এখন সেবাদাতাদের দিয়ে করিয়ে নেবার প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠছে। এই সার্ভিস বা সেবামুখিতার প্রবণতা গ্রাস করেছে শিক্ষার্থীদেরও। তারা এখন নিজে মাথা খাটিয়ে কিছু বুঝতে চায় না। বোঝার জন্যে সাধনা না করে বরং টিউটরের বোঝানো কথা মন্ত্রবৎ মনে রাখায় তৎপর। ছাত্রদের পড়াশোনার ভার যেন টিউটদের ওপর অর্পিত হয়েছে। বিদ্যার্থীদের তারা বিদ্যা গিলিয়ে দেন।

শিশুর জন্যে মায়ের বুকের দুধের কোনও বিকল্প নেই। তারপরেও বাজারে গুঁড়ো দুধ ও সিরিয়াল জাতীয় খাবার পাওয়া যায়। কারণ যে শিশু মাতৃদুগ্ধ পর্যাপ্ত পরিমাণে পায় না, তাকে অভুক্ত রাখা যাবে না। তাকে তো সহায়ক খাবার দিতেই হবে। সে জন্যে বাজারে শিশুখাদ্য নিষিদ্ধ করা হয়নি। কিন্তু শিশুখাদ্যের এই প্রাপ্যতার সুযোগে আমাদের অনেক মা এবং পরিবার বুকের দুধ ছেড়ে কৃত্রিম খাদ্যের নির্ভর করেন। এতে শিশুর সুষম বিকাশ বিঘ্নিত হলেও কেউ সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না।

শিশুখাদ্যের মতোই প্রাইভেট-টিউশন বা গৃহশিক্ষকের সহায়তাও কারো কারো জন্যে দরকারি। কারণ সব শিক্ষার্থীর মেধা ও দক্ষতা সমান নয়। সব বিষয়ে সবার সমান দখলও থাকে না। তাই যে শিক্ষার্থী যে বিষয়ে বা পাঠের যতটুকু অংশ বুঝতে অক্ষম সেটুকু উতড়াতে প্রাইভেট পড়া বা কোচিং করায় দোষের কিছু নেই।সেজন্যে সরকার কোচিং বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করেননি।

কিছুদিন আগেও প্রাইভেট পড়া বা কোচিং করাটা ছিল শিক্ষার্থীদের জন্যে নোট-গাইড পড়ার মতো লজ্জার। অভিভাবকরাও নিঃশর্তভাবে সকল বিষয়ে প্রাইভেট বা কোচিংয়ের জন্যে টাকা ছিলেন কুণ্ঠিত। অভিভাবকগণ যখন নিশ্চিত হতেন তাদের সন্তান প্রাণপণ চেষ্টা করেও পেরে উঠেনি তখনই প্রাইভেট-কোচিংয়ের অনুমতি এবং টাকা দিতেন। দেখা যেত একটা দুটো বিষয়ের বেশি কাউকে প্রাইভেট পড়তে বা কোচিং হয়নি। কারো একমাস কারো বা দু-চার মাস।

এখন দিন বদলে গেছে। সাপলিমেন্টারি ফুডের ওপর শিশুর নির্ভরশীলতাকে ছাড়িয়ে গেছে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট-টিউশনির ওপর নির্ভরশীলতা। এখন শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে ভর্তি হয়েই কোচিং বা প্রাইভেটে ঢুকে যায়- পাঠ্যবই কেনা হোক বা না হোক, ক্লাস শুরু হোক বা না হোক। আসলে প্রাইভেট-টিউশনি এখন একটি ফ্যাশন আর প্যাশনে পরিণত হয়েছে। কোনও শিক্ষার্থী প্রাইভেট না পড়লে অভিবাবকগণও তাদের সন্তানদের পড়ালেখার প্রতি মনোযোগ নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। কোচিং ও টিউশনি এখন গণিত, ইংরেজি বা বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা কিংবা ইসলামের ইতিহাসও এখন আর বাদ যায় না। কোচিং সেন্টারগুলো এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমান্তরাল অবস্থানে চলে এসেছে।

শিক্ষকের সমান্তরাল এখন টিউটর কোচিং স্টাফ। প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডলের পঠনপাঠনের চেয়ে শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ এখন কোচিং ক্লাসের দিকে। কারণ সেখানে তারা নগদ টাকা উসুল করার চাপ অনুভব করে। প্রাতিষ্ঠানিক বিধিনিষেধ এবং শৃঙ্খলা সেখানে নেই। অনেক শিক্ষক নামধারী এবং কোচিং সেন্টার শিক্ষার্থীদের অনির্মল ও অনৈতিক বিনোদনের আয়োজন করে বলেও অভিযোগ আছে।

সরকারি বিধিনিষেধের কারণে সরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষকদের অনেকে এখন টিউশনি বা কোচিং বাণিজ্য গুটিয়ে এনেছেন বা আনছেন। কিন্তু এতে কোচিং বাণিজ্যে কোনো ভাঁটা পড়েনি। কারণ ভালো স্কুল-কলেজ ঘিরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার, টিউশন কেন্দ্র। চটকদার বিজ্ঞাপন, দেওয়াল লিখন এবং প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এজেন্টের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের এসবে টানা হয়। শিক্ষার্থীরা একটি অন্ধ মোহ বা ঘোরের মধ্যে এক সেন্টার থেকে আরেক সেন্টারে, এক শিক্ষকের কাছ থেকে আরেক শিক্ষকের কাছে দৌড়ায়।

কোচিং সেন্টারগুলোতে পড়ানো শুরু হয় সকাল সাতটায়। যে ছেলেমেয়েটির বাড়ি দূরে তাকে তাকে সকাল সাড়ে পাঁচটা বা ছ-টায় উঠে কোচিং প্রাইভেটের জন্যে ছুটতে হয়। কোনো খাবার মুখে দেবার সময় ও সুযোগ তাদের হয় না। পরপর দু-তিনটা কোচিং ক্লাস শেষে সে যখন শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে তখন সে ক্লান্ত, ঘুমকাতর এবং ক্ষুধার্ত। ক্লাসের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকগণ প্রাইভেট-টিউশনি বন্ধ রাখলেও বন্ধ থাকে না প্রতিষ্ঠানবহির্ভূত শিক্ষকদের পড়ানো। অনেক ছাত্রছাত্রী ক্লাস না করে প্রাইভেটে ব্যস্ত থাকে। আর যারা ক্লাসে আসে তাদের বেশিরভাগ শ্রেণিকক্ষের পঠনপাঠনে মনোযোগী থাকে না। কারণ তাদের মন পড়ে থাকে বাইরে, আরেক কোচিং সেন্টারে। ক্লাসের সময়টা অনেকের কাছে অপেক্ষার প্রহরমাত্র। দুপুর একটা থেকে কোচিং-প্রাইভেটের নতুন পর্ব শুরু হয়। সাড়ে বারোটার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ফাঁকা হতে থাকে। শিক্ষার্থীদের গন্তব্য তখন কোচিং সেন্টার কিংবা স্যারদের বাসা। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই শিক্ষাবাণিজ্যের কারবার। সন্ধ্যায় যখন এই ছেলেমেয়েরা ঘরে ফিরে তখন তারা ক্লান্তি, শ্রান্তি ও ক্ষুধায় থাকে জেরবার। যে ছেলে বা মেয়েটি ভোরবেলা কিছু মুখে না দিয়ে বের হয়েছিল সারাদিনে তার পেটে হয়তো পড়ে দোকানের দু-একটা সিঙ্গারা বা সমুচা। তাই তো কোচিংবাণিজ্যের ফাঁদে পড়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী অপুষ্ট ও ভগ্নস্বাস্থ্যের অধিকারী। অথচ কৈশোর ও প্রাক-যৌবনের এই বয়সটা তাদের শারীরিক বিকাশ ও পরিপুষ্টির জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অথচ তাদের অনেকে পর্যাপ্ত খাবার গ্রহণ করতে পারছে না কোচিংবাণিজ্যের চক্রে পড়ে। এই লেখক এমন অনেক শিক্ষার্থীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন যারা দিনের পর দিন দুপুর পর্যন্ত অভুক্ত থাকে।

বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে, সকালে মানুষের মস্তিষ্ক সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ও সুস্থির থাকে। এ সময় মানুষের বোধগম্যতার ক্ষমতা বেশি থাকে। মুখস্থ ও আত্মস্থ করার অনুকূল সময় এটা। কিন্তু ভোরের সেই নির্মল পরিবেশে পড়ার টেবিলে বসছে না একালের শিক্ষার্থীরা। কোচিংবাণিজ্য শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। তারা সাতসকালে ছোটে শিক্ষকের বাসায় কিংবা কোচিং সেন্টারে। সারাদিন তারা কোচিংচক্রে ঘুরে ঘুরে যে ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফিরে, তাতে রাতের বেলাতেও পড়ার টেবিলে বসা সম্ভব হয় না তাদের। আড্ডা, গল্প বা নির্মল বিনোদনের জন্যেও তাদের থাকছে না সময়। টেলিভিশন, ফেসবুক, ইউটিউবে আগ্রহ থাকলেও সৃজনশীল বই পড়ার অভ্যাস এখনকার শিক্ষার্থীদের নেই বললেই চলে। ফলে তাদের ভেতরসত্তা বা মনোলোকে একটি ফাঁকা অন্ধকার জগতের সৃষ্টি হয়েছে। এই ফাঁক গলে এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের মনোজগতে ঢুকে পড়ছে অসুন্দর ও বিকৃত আনন্দের নেশা। ফলে অশ্লীল চটি সাহিত্য ও পর্নোগ্রাফির প্রতি ঝুঁকে পড়ছে বাড়ন্ত ছেলেমেয়েরা। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকা শহরের ৭৭ ভাগ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। রাতের বেলাটা এই বিকৃতবিনোদনের সময়।

কোচিং ও প্রাইভেটের প্রতি অতিমাত্রায় ঝোঁক শিক্ষার্থীদের সেলফ এসেসমেন্ট বা আত্মমূল্যায়নের ক্ষমতা এবং আগ্রহকে সংকুচিত করছে। তারা নিজেরাও জানে না তারা কোনটা বুঝে, কোনটা বুঝে না। কোনটা পারে কোনটা পারে না। কারণ পারা না পারার প্রশ্নটিই তাদের সামনে আসছে না। প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং সেন্টারগুলো সব প্রশ্নের সমাধান নিয়ে হাজির রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের আত্মশক্তি বিনষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সাধনা ও সংগ্রামের চেতনা মুছে যাচ্ছে তাদের মন থেকে। পরনির্ভর ও আত্মশক্তিহীন মানসচেতনা নিয়ে তারা উচ্চশিক্ষার স্তরে পদার্পণ করছে। এগিয়ে যাচ্ছে জীবনযুদ্ধের পরবর্তী স্তরেও।

এই কোচিংবাণিজ্যের প্রসার শিক্ষার্থীদের কেবল পড়ার টেবিলচ্যুত করেনি, শ্রেণিকক্ষের পঠনপাঠন কার্যক্রমকেও বাধাগ্রস্ত করছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসের সময়টাকে কোচিংয়ের বিরতিকাল হিসেবে মনে করে। ফলে শ্রেণিশিক্ষকের পাঠ তাদের মনে রেখাপাত করতে পারে না।

শিক্ষকদের পাঠদান অর্থহীন হয়ে পড়ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে নিয়োজিত সচেতন শিক্ষকমাত্রেই এই বিষয়টি লক্ষ্য করে বিব্রত ও উদ্বিগ্ন।মূল পাঠ্যবই বোঝার বদলে প্রাইভেট টিউটরের বা কোচিং সেন্টারের প্রশ্নোত্তরকেন্দ্রিক শেখানো বুলি কণ্ঠস্থ করতেই তারা বেশি তৎপর। ফলে শিক্ষার মূল চেতনা থেকে তারা চলে যাচ্ছে দূরে। বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের দৈন্য তাদের গ্রাস করছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্দেশ্যকে করছে ব্যাহত।

পড়ার টেবিল ছাত্রছাত্রীদের ঠিকানা। বলা যায় তাদের সাধনক্ষেত্র। তাই আবার তাদের ফিরিয়ে আনতে হবে পড়ার টেবিলে। সেজন্যে রাশ টেনে ধরতে হবে কোচিংবাণিজ্যে। শিক্ষার্থীদের কোচিং-টিউশনির ঘোর থেকে মুক্ত করতে হবে শীঘ্র।নইলে গোটা জাতিকে দিতে হবে বড় মাসুল।

লেখক: ফাতিহুল কাদির সম্রাট
সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা,
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ, লক্ষ্মীপুর

No Comment.