সহজ হবে কী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন


অথর
সম্পাদকীয় ডেক্স   ঢাকা বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১৮ আগস্ট ২০১৯, ৯:২৯ অপরাহ্ণ | পঠিত : 192 বার
সহজ হবে কী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

আগামী ২২ আগষ্ট প্রথমবারের মতো শুরু হতে যাচ্ছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।প্রাথমিক পর্যায়ে সাড়ে তিন হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মায়ানমার সরকার। মুসলিম অধ্যুষিত স্বাধীন আরাকান রাজ্য বার্মা দখল করে নেওয়ার পর প্রাদেশিক শাসন জারি করে নতুন নামকরন করে রাখাইন।তখন থেকেই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মায়ানমারের শাসকদের হাতেচরম নির্যাতন নিপীড়ণ বৈষম্য ও মৌলিক অধিকার বি ত হয়ে আসছে।প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ রাখাইন রাজ্যটি রোহিঙ্গা শূণ্য করার অভিলাষে ১৯৭৪ সালে মায়ানমার সেনাবাহিনী প্রথমবারের মতো গণহত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করে বাংলাদেশে পুশইন করে।তখন প্রায় ৫ লাখ মুসলিম রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে তৎকালীন সরকারের কুটনৈতিক সাফল্যে দুই লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছিল

বাংলাদেশ।উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের ২৫ আগষ্ট মায়ানমার সেনাবাহিনী নতুন করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ¦ালিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে জবাই করে হাত পা মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ও রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষন করে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।যাতে করে মুসলিম রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।বাংলাদেশ সরকার মানবিক কারনে সীমান্ত খুলে দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ সহজ করে দেয়।এতে নতুন করে আট লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে।আগের তিন লাখের সাথে নতুন যোগ হয়ে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে।কিন্তু মানবতার দায়ে আশ্রিত এই বিপুল জনগোষ্ঠী এখন যেন দানব হয়ে আশ্রয়দাতাকেই গিলে খেতে চাইছে।মানব পাচার মাদক পাচারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে রোহিঙ্গারা

একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘœীত করছে।অপরদিকে এশিয়ার আ লিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে।তাছাড়া তারা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক নৈস্বর্গ পার্বত্য অ লের পরিবেশ প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র করছে ধ্বংস।তাই কুটনৈতিক তৎপরতা ও বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে প্রত্যাবাসন করাই মঙ্গল হবে বাংলাদেশের জন্য।প্রশ্ন হলো,নিজ দেশে ফিরতে অনীহার কারনে সহজ হবে কী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন? প্রশ্ন হচ্ছে মৌলিক অধিকার নিশ্চিতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের দাবি পূরণ না হলে তারা কী ফিরতে চাইতে নিজভূমে?তাছাড়া নতুন করে জন্ম নেওয়া দেড়লাখ শিশুসহ ১৩ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে নগণ্য সংখ্যক ফেরানোর প্রক্রিয়াটি মায়ানমার সরকারের আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেনা।এদিকে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন বলছেন,রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরতে তাদের বোঝানো

হচ্ছে।নাগরিকত্ব না পেয়ে নিজ দেশে ফিরলে জেনে শুনে বিষ পান করার শামিল হবে এটা ভালো করেই জানে রোহিঙ্গারা।তাই অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান যতই বোঝানো হোক তারা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে নিজ দেশে ফিরতে চাইবেনা।তাছাড়া এই জনগোষ্ঠীর সাথে এখন জড়িয়ে আছে দেশী বিদেশী অনেক বহুজাতিক এনজিও ও সংস্থার স্বার্থ।এইসব সুবিধাভোগী গোষ্ঠীও মানবতার দোহাই দিয়ে প্রত্যাবাসনে বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারে।তবে কী তিনদশক ধরে চলে আসা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান অসম্ভব? তবে কী ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বইতে হবে বহুকাল ?জাতিসংঘ কী সক্ষম হবে চীন-রাশিয়া-ভারতকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি করাতে?সন্দেহ জাগে মনে,কর্পোরেট সংস্কৃতির সংগায়-পড়হঃৎড়ষ ঃযব ংঃৎধঃবমু হড়ঃ যঁসরহরঃু অর্থাৎ ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থবাদের কাছে মানবতা

অর্থহীন। স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়ে তারা মানবতার ডাকে সারা দেবে এমনটা ভাবা বোকামি।কেননা রাখাইন রাজ্যে অর্থনৈতিক অ ল গড়ে তোলে তারা বিনিয়োগ করেছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।সেই সাথে অস্ত্র ব্যবসা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবতো রয়েছেই। ব্রিটিশ শাসন অবসানের পর ১৯৪৮সালে তৎকালিন বার্মার সরকার ইউনিয়ন সিটিজেনশিপ অ্যাক্টের মাধ্যমেও রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেছিল।কিন্তু সামরিক সরকার ১৯৮২ সালে নাগরিক আইন জারি করে ১৩৫ টি জাতিকে স্বীকৃতি দিলেও রোহিঙ্গাদের বি ত করে। ক্ষোভের অনলে পুড়তে থাকে রোহিঙ্গাদের মন। প্রতিশোধ পরায়ন ও স্বাধীনতা ফিরে পেতে গড়ে তোলে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বা আরশা ।যার নেতৃত্বে রয়েছেন তোহার জাকির নামের এক রোহিঙ্গা যুবক।তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে মক্কা প্রবাসী রোহিঙ্গা নেতা আতা উললাহ্ ও মুফতি জিয়াবুর রহমান। আরশা’কে সশস্ত্র জিহাদি সংগঠন গুলো অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা দিয়ে আসছে অভিযোগ মিয়ানমার সরকারের।তাই রোহিঙ্গাদের জঙ্গি ও বাঙ্গালী সন্ত্রাসী বলে দমনের নামে চালাচ্ছে নিধর যঙ্গ। কথা হলো যুবক শ্রেণীর রোহিঙ্গারা না হয় তাদের জাতিকে দীর্ঘদিনের নির্যাতিত জীবন থেকে মুক্তি দিতে সংগ্রামের ডাক দিয়েছে।কিন্তু শিশু-নারী-বৃদ্ধ এদের কি দোষ? কিয়দংশ সংগ্রামী রোহিঙ্গার জন্য জাতিগত নিধন মানবতাবিরোধী অপরাধ ও সভ্যতার অভিশাপ নয় কী? নোবেল প্রাপ্ত শান্তির দূত অংশান সু চি’র হাতেই তো রোহিঙ্গা মুসলিমদের রক্ত।যে মানুষট্ িগণতন্ত্র ফেরাতে কয়েক দশক নির্যাতিত হয়েছেন,সেই কিনা ২০১৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর দেয়া ভাষনে রাখাইন গণহত্যাকে অস্বীকার করে বিশ^ সম্প্রদায়ের চাপে ভীত নন বলে ভাষন দিলেন।গনতন্ত্রের মানস কন্যা ক্ষমতার মোহে হয়ে গেলেন বিষকন্যা।ঐসময় জাতিসংঘে মিয়ানমারের ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি ম্যান থিও মিথ্যা ভাষনে বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা কেন দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে তা তাদের জানা নেই।। মিয়ানমারের সেনা প্রধান মিন অং হেলাইন স্পষ্ট জানিয়েছিলেন,তারা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না।আবার রোহিঙ্গারা যাতে ফিরতে না পারে সেজন আর্ন্তজাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমানায় পুঁতে রেখেছে স্থল মাইন । যাইহোক আগামী ২২ আগষ্ট প্রত্যাবাসন সূচনায় আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।এটা অবশ্যই বাংলাদেশ সরকারের ধৈর্য ধরে কুটনৈতিক সাফল্যের অংশ বলেই প্রতিভাত হচ্ছে।তবে এখন্ োপাড়ি দিতে হবে দীর্ঘপথ।তাই জাতিগত নিধনে দায়ী মায়ানমার সরকারকে বিশ^াস করে বসে থাকলে চলবেনা।ধারাবাহিক প্রত্যাবাসনে অব্যাহত চাপ ও বিশ^ জনমত গঠণ প্রক্রিয়া চলমান রাখতে হবে।পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনা কর্তৃক ওআইসিতে পেশকৃত ৬ দফা ও জাতিসংঘে প্রদত্ত ৫ দফা বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে।অন্যদিকে স্টেকহোল্ডার রাষ্ট্র ভারত চীনকে বোঝাতে হবে যে,আমরা নিজেরাই নানাসমস্যায় জর্জরিত।আমাদের পক্ষে দীর্ঘদিন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভার বহন করা সম্ভব নয়।কেননা বড় অর্থনীতির বড় দেশ চীন ভারতকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে রাজি করাতে পারলেই সহজ হবে প্রত্যাবাসন ।

আব্দুর রহমান লাবু
লেখকঃ সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক, ঠাকুরগাঁও।
mdlabu.journalist@gmail.com