হে আদর্শ শিক্ষক!


অথর
শিক্ষক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :১৫ মে ২০১৯, ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ
হে আদর্শ শিক্ষক!

মানবিক,আদর্শিক,নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গঠনে তুমি প্রতিক্ষণের মানবিক মানুষ।পাঠদানে স্বচ্ছন্দ গতিতে পথ রচনা করে সুন্দর এবং মানবিক সমাজ বিনির্মাণ করবার প্রয়াসে একইসাথে সত্য-সুন্দর আর আলোকময় শিক্ষা দেওয়ার দীক্ষা নিয়েই তুমি মানুষ গড়ার কারিগর,ভবিষ্যত সুশিক্ষিত জাতি গড়ার কারিগর।বাংলদেশে সুদক্ষ, আদর্শিক মানব নির্মাণের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছ তুমি, এ আর নতুন কী?যুগ যুগ ধরেই শিক্ষক সমাজ অবহেলিত।
আমাদের সমাজ,রাষ্ট্র চায় -শিক্ষকরা পূরনো শার্ট,ছেড়া জুতা পরে, আধপেটা নুনভাত খেয়ে বিষন্ন বদনে উন্নত, ফলপ্রসূ,দীর্ঘস্থায়ী শিখনে,শিক্ষার্থীর সুপ্ত আগ্রহ,প্রেষণা জাগিয়ে তুলুক।তুমি পরিবারকে ভাল জীবনমানে স্বাচ্ছন্দে, আয়াশে থাকার একটা ঘর- বিছানা- প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র না দিতে পেরে,বাবা-মা,স্ত্রী- সন্তানকে এমনকি পরিবারের কারো আশার সমান কিছু দিতে না পেরে, প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ

হীনমন্যতায় ভুগছো।পড়ানোর সময় তুমি ক্ষণে ক্ষণে আনমনে হয়ে ভাব- আমরা অবলোকন করছি।ভাবছো ধার – দেনা,ঋণের কথা,পাওনাদার দেখলেই টাকা চাইবে- দেব কোথা থেকে? কোথায় পাব-সঠিক সময়ে সন্তানের ভর্তিসহ শিক্ষার আনুসাঙ্গিক খরচ?আমরা দেখছি তুমি কোন দোকানদারের কাছ থেকে বাঁকিতে চাল- ডাল- লবন- তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনছো- লজ্জাবনত মস্তকে দোকানদারকে আশ্বস্ত করছো আগামী মাসে বেতন পেলেই সব টাকা শোধ করে দেব। কোথায় কী করছ, কখন কী ভাবছ, কখন কী লিখছ, কখন কোথায় যাচ্ছ, আর আপন মনে নিজভুমে রচনা করছ স্মৃতির ফলক- তোমার অজস্র ছাত্রছাত্রী।যারা বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ায়া পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে- বিভিন্ন পেশায়,কেউ কেউ ব্যস্ত আছে উচ্চতর ডিগ্রিধারী চাকরির খোঁজে,কেউ কেউ

নিতে ব্যস্ত উচ্চতর ডিগ্রি কিংবা কেউ কেউ সমসাময়িক বিশ্বে নিজেকে কর্মোপযোগী করতে ব্যস্ত কারিগরি দক্ষতার সার্টিফিকট অর্জনে।
তোমার শিক্ষার আলো নিয়ে কেউ ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,উদ্যোক্তা, শিক্ষক উকিল, ব্যারিস্টার।
সবার ভাগ্যের বদল হয়- তোমার দেয়া সুশিক্ষা আর দীক্ষা নিয়ে।বদল হয় না তোমার জীবনমান,সামাজিক ও পারিবারিক হয়রানি- পেরেশানি। তৃপ্তি মতো মনে হয় যখন যা ইচ্ছা হয় নিজেও খেতে পাও না,সন্তানের মুখেও তুলে দিতে পার না।।মানুষের জন্য, সমাজের জন্য, আগামীর জন্য কল্যাণ নিশ্চিত করবে তোমার শিক্ষাদান।কারণ শিক্ষাই পারিবারিক,সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের একমাত্র অস্,ত্র তাই বলে দিচ্ছে —- আমাকে, আমাদের সবাইকে। তোমাকে অভিবাদন হে মানবিক শিক্ষাগুরু,হে অভিভাবক !!!

এ জগত- সংসারের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল হোতাদের তুমি চেননা

– কারণ তুমি মানবতার গুরু।ওরা কেউ চায় না তোমার সন্তান রাষ্ট্রের বড় কোন পদের আসনে গিয়ে বসুক।সেই আসনে তোমার সন্তান যেতে পারলে দপ্তরের ঘুষখোরদের ঘুষ খাওয়া স্থবির হয়ে যাবে।তুমি আদর্শ শিক্ষক হয়ে অন্তত তোমার সন্তানকে অসৎ কাজ করার শিক্ষা দিতে পার না।

এসব কারণেই তোমার পূর্ণাঙ্গ বাড়ি ভাড়া, উৎসব ভাতা,সন্তানের শিক্ষা ভাতা,চাকরির ক্ষেত্রে সন্তানের জন্য কোন কোটা নেই।

তোমার পেনশনের টাকা কী তুমি আদৌ পাবে?পেলেও মরনের পরে।তখন তোমার সন্তানেরও শিক্ষাজীবন, চাকরির প্রার্থিতার জীবন শেষ।সেই টাকা সন্তানের উদরপূর্তীর জন্য কাজে লাগলে লাগতেও পারে।

সরকারি চাকরিজীবিদের দেখেছি,পূর্ণাঙ্গ বাড়িভাড়া থেকে একটা বসবাসযোগ্য অথচ বিলাসবহুল বাড়িতে স্ত্রী- সন্তান নিয়ে সুখে- স্বাচ্ছন্দে থাকে।প্রয়োজনে বাবা- মাকে রাখে।দুই ঈদ বোনাস,বৈশাখী

ভাতা পেয়ে বিলাসবহুল আসবাবপত্র কিনে কিংবা সন্তান কর্মোপযোগী শিক্ষার পিছনে বিনিয়োগ করে।

এহেন চাকরি জীবনে পুরুষ চাকরিজীবি ও মহিলা চাকরিজীবি যেই হোক না কেন আর্থিক স্বচ্ছলতা স্বামীর প্রতি স্ত্রীর,স্ত্রীর প্রতি স্বামীর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেয়।দুঃসময়ে একজন অন্যজনকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে।শহরে জমি কিনে,বাড়ি বানায়।অভাব নেই,অর্থের টানাটানি নেই সন্তানরাও যোগ্যতার আসনে নিজেকে তুলে আনে।

আর্থিক দৈন্যতা সাময়িক হলে তা মিটানো যায়।একটানা দীর্ঘ আর্থিক দৈন্যতা – পরিবারের প্রত্যেকটি সদস্যের জন্য অস্থিরতা, দুঃসহ যন্ত্রণা।অভাব অনটনের সংসারে অশান্তি লেগেই থাকে।কত না পাওয়া,কত অতৃপ্তি নিয়ে বেঁচে থাকে মানুষগুলো।এই অসহনীয় দৈন্যতা কোন একটা সময় দৈবাৎ পূরণীয় নয়।যার কারণে সন্তানগুলো হতাশা- নিরাশায় জীবনী শক্তি শেষ করে দেয়।মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।বাবা- মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করে,বিদ্রোহ করে- একসময় অবাধ্য সন্তানে পরিণত হয়।তুমি তোমার এই সন্তানকে কিছু বলতে পার না।তুমি যে আদর্শ শি্ক্ষক,তুমি মানুষ গড়ার কারিগর।অথচ তুমি তার স্বপ্নগুলোর কোনটাই মিটাতে পারছো না।তাই বিদ্রোহ করছে, দিনের পর দিন সহ্য করতে করতে একসময় তোমার অবাধ্য হচ্ছে তোমার সন্তান।আধুনিক ছেলেমেয়েরা তাদের সমবয়সী,সহপাঠির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চায়।যখন কখনও পারবেই না ভেবে ক্লান্ত হয়- তখনই বিদ্রোহ করে,অবাধ্য হয়।পৃথিবীর সবাই স্বার্থপর – সন্তানও তোমার সম্মানের দিকে তাকায় না।বরং তোমার সম্মানই তোমার জন্য বিড়ম্বনা।সমাজের আর দশটা লোক যদি শুনে- জানে তোমার সন্তান তোমার সাথে তর্ক করে,কথায় কথায় বিদ্রোহ করে,বলবে শিক্ষক হয়েও নিজের সন্তান মানুষ করতে পারলো না।কিন্তু এর জন্য দায়ি রাষ্ট্র পক্ষ থেকে তোমার অবমাননা,অবহেলা অসম্মান।
তুমি ওদের পছন্দমতো বিয়েও দিতে পারছো না।অভাব আর দৈন্যতার সংসারে সমাজের অন্য কেউ আত্মীয় করতে ইন্টারেস্ট দেখায় না।তুমি আদর্শ শিক্ষক, সস্তা সালাম ছাড়া আর কী আছে তোমার?
তোমার মেয়ে মনের মত স্বামী পায় না আর তোমার ছেলে মনের মতো বউ পাবে না।তুমি পাবে না মনের মত আত্মীয়।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে শিক্ষকও বুঝে গেছে আমাদের আর দিন বদল হবে না।তাই আর্থিক দৈন্যদশা মিটাতে, মৌলিক চাহিদা পূরণেই নেমে পড়েছে শিক্ষা নিয়ে ব্যবসায়। এই দৈন্যতা মিটানোর জন্য কিছু শিক্ষক প্রাইভেট, কোচিং বানিজ্যে নিজেকে জড়িয়ে পেশাসূলভ আচরণ ভুলে গেছে।

জাহানারা সরকার
সহকারী শিক্ষক
পুলিশ লাইনস্ হাই স্কুল,ফরিদপুর।