৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা মহাবিপাকে বেশিক সমাজ


অথর
শিক্ষক নিউজ ডেক্স   খোলা মতামত
প্রকাশিত :৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৮:০১ পূর্বাহ্ণ | পঠিত : 127 বার
৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা  মহাবিপাকে বেশিক সমাজ

গত ২৯ আগষ্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ১০ টাকার টিকেট কেটে চোখ দেখিয়েছেন। শোনা গেছে সম্প্রতি তিনি লন্ডনেও চোখের চিকিৎসা করিয়েছেন। কয়েক দিনের মাথায় আবারো চোখ দেখাতে হলো, হতে পারে কোন সমস্যা। তবে যেভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা হলো তাতে মনে হচ্ছে তিনি দেশবাসীকে এটা বোঝাতে চেয়েছেন যে, চিকিৎসার জন্য বিদেশে কিংবা দেশের নামী-দামী চিকিৎসাকেন্দ্রে বিপুল অর্থ ব্যয় করার প্রয়োজন নেই। সরকারিভাবে পরিচালিত হাসপাতাল তথা চিকিৎসা কেন্দ্রেই স্বল্প অর্থ ব্যয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা যেতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের মৌন আহ্বান অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা সৃষ্টির প্রতীক।
চিকিৎসা

মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বাস্থ্য ভাল থাকলে মন ভাল থাকে, কাজে মনোযোগী হওয়া যায় ফলে সফলতা অনিবার্য। কিন্তু দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাখাতের ৯৫ শতাংশ যাদের ওপর নির্ভর করছে তারা আজ কেমন আছেন? শারীরিকভাবে কি সুস্থ্য আছেন? আমার মনে হয় বেসরকারি শিক্ষক সমাজের কমপক্ষে ৮০ শতাংশই নানাবিধ রোগে ভূগছেন। খোঁজ নিলে দেখা যাবে এ সমাজের রোগের মধ্যে গ্যাসট্রিক, ডায়াবেটিস, চোখের সমস্যা, মাথার সমস্যা, কোমর ব্যাথা, পা ব্যাথা, শারীরিক দূর্বলতা, পাইলস্ প্রভৃতি অন্যতম। আর এসব রোগ সৃষ্টির অন্যতম কারণগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- হতাশা, মানসিক টেনশন, অপুষ্টি, অপ্রতুল কায়িক শ্রম, সুচিকিৎসার অভাব প্রভৃতি।
বেসরকারি শিক্ষক সমাজ যে বেতন পান

তা দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করাই বর্তমান দূর্মূল্যের বাজারে প্রায় অসাধ্য হয়ে ওঠেছে। তাদের এবং পরিবারের বিদ্যমান রোগের সুচিকিৎসা করার মত সামর্থ্য ক’জনের আছে? প্রধানমন্ত্রী মহোদয় ১০ টাকায় যেমন চোখের চিকিৎসা করিয়েছেন ঠিক তেমনি বেসরকারি শিক্ষকগণ যদি ১০ টাকায় চোখের চিকিৎসা, ১৫ টাকায় ডায়াবেটিসের চিকিৎসা, ২০ টাকায় অন্যান্য চিকিৎসাগুলো করাতে পারতেন তাহলে হয়তো আমাকে এ প্রসঙ্গটি নিয়ে আসতে হতো না। কিন্তু সেবামূলক খাত হওয়া সত্বেও বাংলাদেশে বর্তমানে চিকিৎসা খাতটি সবচেয়ে বেশি কলুষিত হয়েছে। ফলে সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা চিকিৎসার জন্য সচরাচর ভারত যান। রাজধানী থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত সরকারিভাবে যে সব চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে ওঠেছে সেগুলোতে যারা চিকিৎসা নিতে গিয়েছেন তারাই তিক্ত অভিজ্ঞতা

অর্জন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী মহোদয়ের চোখ পরীক্ষার জন্য নিশ্চয়ই সেদিন হাসপাতালের কোন ডাক্তার চেয়ারে বসে থাকার সুযোগ গ্রহণ করেন নি কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের মত হতভাগারা যখন কোন সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে যায় তখন তার জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা থাকে না এমনকি ন্যূনতম সহানুভূতিটুকুও পাওয়া যায় না। সাধারণ রোগীদের সাথে বেসরকারি শিক্ষকদেরকেও লাইনে দাঁড়াতে হয়। চিকিৎসকের কাছে রোগের বিবরণ বলার আগেই জিজিটালাইজড পদ্ধতিতে প্রেসক্রিপশন হয়ে যায়! সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে গড়ে প্রতি মিনিটে একজন রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়! ডাক্তার মশাইরা দুপুরের পর রোগী দেখার কথা কল্পনাও করেন না তাই যত দ্রুত সম্ভব রোগী দেখা শেষ করতে পারলেই তাদের ছুটি। চলে যান প্রাইভেট প্রাক্টিসে। অধিকাংশ

ডাক্তারদের প্রাইভেট প্রাক্টিসে আগ্রহ বেশি কেননা সরকার মাসে যা বেতন দেয় প্রাইভেট প্রাক্টিসে এক দিনেই সে বেতন পাওয়া যায়। সার্জন হলে তো হিসাবের কোন দরকারই নেই। জনগণের টাকায় পরিচালিত চিকিৎসাকেন্দ্রের ওপর ভরসা করতে না পারাই আজ প্রাইভেট প্রাক্টিসের বাজার জমজমাট। সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে ভাল চিকিৎসা সেবা পাওয়া গেলে প্রাইভেট চেম্বারে রোগীর এত ভীড় হতোনা, ডাক্তারদের আয়ও কমে যেত। ডাক্তার মশাইদের আয় বৃদ্ধির জন্যই হয়তো সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে ভাল চিকিৎসা হয় না।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মত রোগ হলে তো কথাই নেই। গিয়ে দেখা যায় বেড নেই, রাতের বেলা হলে ডাক্তার নেই, ফ্লোরে থাকতে হবে যদিও অনেক রুম খালি পড়ে আছে ভিআইপিদের আসার অপেক্ষায়। ভাগ্য ভাল হলে ডাক্তারের দেখা পাওয়া যায় আর ভাগ্য খারাপ হলে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়, রোগী যতই জরুরী হোক না কেন। অধিকাংশ নার্সের আচরণ দেখলে মাথা খারাপ হওয়ার জোগার। মনে হয় ওনারা রোগীর সেবা করার জন্য নিয়োগ পাননি, নিয়োগ পেয়েছেন রোগী এবং তার লোকজনের সাথে খারাপ আচরণ করার জন্য! টাকা না দিলে কোন কাজ হয় না, ফিরেও তাকায় না। ঔষধতো সব কিনতেই হয়, সরকারিভাবে যে ঔষধগুলো আসে সেগুলো যে কোথায় যায় ওনারাই ভাল জানেন। বেসরকারি হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে ভাল চিকিৎসা সেবা পাওয়া যায় কিন্তু টাকা তো থাকতে হবে। বেসরকারি শিক্ষক সমাজ যে বেতন পান তাতে বেসরকারিভাবে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করতে গেলে তিন বেলা খাওয়া জুটবে না। কেননা ডাক্তারের ভিজিট, ব্যাঙের ছাতার মত গঁজিয়ে ওঠা ডায়াগনষ্টিক সেন্টারের জন্য প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে এক গাদা টেস্ট, কোম্পানীর গুণ গাওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রকারের ঔষধ সব মিলে হতভাগা বেসরকারি শিক্ষকের এক মাসের বেতন সামান্য রোগের চিকিৎসায় শেষ হয়ে যায়।
এবার আসি ঔষধের কথায়। বর্তমানে এক বেলা ভাত না হলেও চলে কিন্তু ঔষধ ছাড়া চলতে পারে এমন লোকের সংখা কম, বেসরকারি শিক্ষকের বেলায় তো প্রশ্নই আসে না। যার কোন রোগ নেই কমপক্ষে তার গ্যাসট্রিক তো আছেই। বর্তমানে ভাল কোম্পানীর গ্যাসট্রিকের একটি ট্যাবলেটের দাম ৮ টাকা। ঔষধ কোম্পানীর লোকের সাথে কথা বলে জেনেছি, যে ঔষধের উৎপাদন খরচ ১ টাকা তা আমাদেরকে কমপক্ষে ৫ টাকায় কিনতে হয়। কোম্পানীগুলো লাভের ৪ টাকার মধ্যে নিজের জন্য ২ টাকা, ১ টাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, ১ টাকা ডাক্তার এবং দোকানদারের স্যাম্পল আর গিফট বাবদ ব্যয় করে। কোম্পানীর মালিক মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিয়ে ব্যবসার সম্প্রসারণ, আলীশান বাড়ি, কোটি টাকার গাড়ী হাকিয়ে বেড়ান। কোন কোন কোম্পানীর মালিক-কর্মকর্তা আবার উড়েও বেড়াচ্ছেন। সরকার এসব দেখছে না, দেখার প্রয়োজন বোধ করছে না। চড়া মূল্যে ঔষধ ক্রয় করতে গিয়ে বেসরকারি শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষের যে নাভিশ্বাস উঠছে সেদিকে সরকার তাকানোর প্রয়োজনবোধ করছে না।
ডাক্তার মশাইদের কথা বাদ দেই কেন? মানব সেবামূলক পেশায় এসে সামান্য কিছু সংখ্যক বাদে তারাও অর্থের পিছনে ছুটছেন। সরকার বেসরকারি শিক্ষকদের যে চিকিৎসা ভাতা দেয় তা দিয়ে ডাক্তার সাহেবের ভিজিট হয় না, বেতন থেকে কেটে ১০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত ভূর্তকী দিতে হয়। একটি বিভাগীয় শহরে দেখেছি চাকুরী করার পর ডাক্তার বাবুরা প্রাইভেট প্রাক্িটসে দৈনিক কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। এত টাকা তারা কি করেন আমি জানি না, কত টাকা প্রয়োজন তাও অজানা। সরকার আইন করে ভিজিটের পরিমাণটা যদি সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতো তাহলে বেসরকারি শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষেরা কিছুটা হলেও স্বস্থি পেতেন।
পাঠক, এই হলো বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবার বাস্তব অবস্থা। বেসরকারি শিক্ষক সমাজ চিকিৎসা খাতে যে ভাতা পান তা নিত্যান্তই হাস্যকর। স্কুল পর্যায়ের সরকারি শিক্ষকগণ এ খাতে যে ভাতা পান তাও পর্যাপ্ত নয়। তারা বেতন, বাড়ীভাড়া মিলে যা পান সেখান থেকে চিকিৎসা ব্যয়ে সাপোর্ট দিতে পারেন কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকরা কি করবেন? ৬ ফুট লম্বা বিছানায় ৪ ফুট চাদর বিছালে যা হয় তাই হচ্ছে। একদিকে টানলে আরেক দিকে হয় না। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্যও চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের রোগ কম হয়, গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তার দিয়েই সেরে যায় কিন্তু বেসরকারি শিক্ষক সমাজকে কায়িক শ্রমের চেয়ে মানসিক শ্রম বেশি দিতে হয়, বসে থাকতে হয় সর্বোপরি মাথা খাটাতে হয় বেশি। সুষম খাদ্য বলতে যা বোঝায় তা ক্রয়ের সামর্থ্য তাদের নেই উপরন্তু কৃষি ক্ষেত্রে কীটনাশক, রাসায়নিক সার, স্টরয়েডের ব্যবহার, পণ্য পাকানো কিংবা টাটকা রাখার জন্য কারবাইড, ফরমালিনের ব্যবহার খাদ্যগুণ নষ্ট করছে। ফলে তাদের জন্য সুস্থ্য থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইতোপূর্বে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য হোমিও চিকিৎসা সস্তা ছিল কিন্তু এখন ৫০০ টাকায় ওটাও হয় না। অবশ্য হুজুরের পানি পড়া পাওয়া গেলে যেতে পারে। বাস্তবতার নিরিখে সরকার কি বিষয়টি ভেবে দেখবেন?
আইউব আলী
অধ্যক্ষ
চিলাহাটি গার্লস্ স্কুল এন্ড কলেজ
ডোমার, নীলফামারী।